পেহলগাম: রক্তাক্ত বিষাদের এক বছর, মানবতার আর্তনাদ

পৃথিবীর স্বর্গ খ্যাত কাশ্মীর। আমাদের কাছে সিনেমার পর্দায় দেখা। গল্পে-সাহিত্যে নানা উপমায় বারবার ফিরে আসে কাশ্মীর স্বপ্নের মতো। আবার বাতির নিচে অন্ধকারের মতোই সেই স্বপ্নের নিচে বছরে পর বছর ধরে কাশ্মীর শুধু শুভ্রতা নয়, রক্তের লালও উপহার দিচ্ছে। যা উপমহাদেশের রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপের নানা দেশ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। তবুও কাশ্মীর দেখার লোভ মনের মাঝে রয়ে গেছে। মাস দুয়েক আগেই ভারত ঘুরে এসেছি। কিন্ত কাশ্মীর যাওয়ার লোভ থাকলেও সাহস হয়নি। কারণ গত বছরের পেহলগামের সেই ভীতি। এবং শুধু আমি নই, ওই ঘটনার পর পুরো কাশ্মীরের পর্যটন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল।

কাশ্মীরের রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে মহাকাব্য রচিত হতে পারে এবং হওয়াও উচিত। যেখানে শত শত মুসলিম মায়ের হাহাকার যেমন থাকবে, কাশ্মিরী পন্ডিতদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার রক্তাক্ত ইতিহাসও থাকবে। কিন্ত গত বছর এই দিনে অর্থাৎ ২২ এপ্রিল যেভাবে নৃশংসভাবে ২৫ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। প্রথমে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF) নামে একটি সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এই সংগঠনটি রাষ্ট্রসংঘের চিহ্নিত জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈবার একটি ‘প্রক্সি’ গ্রুপ। যদিও পরে TRF তাদের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীতে ভারত কাশ্মীরে অন্তত ৫ লক্ষ সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন করেছে।

এই পেহলগাম জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে ভারত ২০২৫ সালের মে মাসে চালানো ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor)-এ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা ও সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। ভারতীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে শতাধিক, কারো মতে ১৫০-এর বেশি বা অন্তত ৩৫-৪০ জন পাকিস্তানি জওয়ান নিহত হয়। এছাড়াও বেশ কয়েকটি জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়।

এই অসম রক্তপাতে কেউ কি আসলে জয়ী হয়েছে? না ভারত, না পাকিস্তান, না ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী। মাঝখান থেকে অন্ধকারে ডুবেছে মানবতা। প্রাণহানি হয়েছে নিরপরাধ মানুষের। আমি ব্যক্তিগতভাবে অপরাধীরও প্রাণহানির পক্ষে না। আমি অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পক্ষের মানুষ। কারণ প্রাণ সৃষ্টির ক্ষমতা যখন বিচারকের নেই, ধ্বংসের ক্ষমতাও থাকা উচিত না।

যখন শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানুষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, তখন তা কেবল একটি অঞ্চলের শান্তি নষ্ট করে না, বরং তা সমগ্র মানব সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, এটি এক জঘন্য, রক্তক্ষয়ী খেলার ক্ষেত্র। যেখানে মানবতার অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।

যে কোনো উগ্রবাদ হলো গভীরতম ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা। তারা ধর্মের আড়ালে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন নৃশংসতা চালায়, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে এক ভয়াবহ আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই মানুষগুলো বিশ্বাস করে যে, তাদের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব তাদের সহিংসতাকে বৈধতা দেবে। এই মানসিকতা এতটাই মারাত্মক যে, এটি যুক্তির কোনো স্থান দেয় না, কেবল ক্রোধ ও হিংসার আগুনই তাদের চালিত করে।

এই ধর্মীয় বিভাজন যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনে পরিণত হয়, তখন এর পরিণতি অনিবার্যভাবে ভয়াবহ। যখন মানুষ একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং সহনশীলতার মতো মানবিক মূল্যবোধগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই বিভাজন কেবল দুটি গোষ্ঠীর মধ্যেকার সমস্যা নয়, এটি সমগ্র বিশ্বকে এক অসহায়তার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্মীয় উগ্রবাদ শুধু যুদ্ধের জন্ম দেয়, মানবিক ক্ষত সৃষ্টি করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহন করে চলতে হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের মতো ধর্মীয় বিদ্বেষ-বিভাজন আধুনিক সময়ে পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই। আমরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান সেই ধর্মীয় উগ্রবাদের বিষে এখনো বারবার জর্জরিত হই। এর বিপক্ষে আমাদের প্রয়োজন সম্মিলিত, নৈতিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ। আমাদের প্রয়োজন সেই কণ্ঠস্বর, যা এই ঘৃণা ও বিভাজনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে। আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে এই উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। আসুন, আমরা প্রমাণ করি যে, ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও, মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক। মানবতার স্বার্থে, আমাদের সম্মিলিতভাবে এই রক্তক্ষয়ী খেলা বন্ধ করে, একটি সহনশীল, শান্তিময় এবং মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ধর্মের নামে অন্যের প্রতি ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং হিংসার বীজ বপন করে। এটি কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করে এবং মানবিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে। সহনশীলতা এবং শান্তির মতো মূল্যবান সম্পদগুলো হারিয়ে যায়। আজ বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধ ও সংঘাত দেখা যাচ্ছে, তার মূল কারণগুলোর মধ্যে এই ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং অসহিষ্ণুতা অন্যতম।

আপনাদের মনে থাকার কথা, সশস্ত্র জঙ্গি হামলার পর স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়, বিশেষ করে পনি রাইড অপারেটররা, আক্রান্ত পর্যটকদের বাঁচাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন এবং স্থানীয় মুসলিম যুবকরা আহতদের সাহায্য করেন। এ ঘটনার পর উপত্যকায় সাধারণ মানুষ “হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই” স্লোগান তুলে শান্তির মিছিল করেন এবং হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

এই অন্ধকার দূর করার জন্য কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহানুভূতি ও সংলাপের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজনকে অতিক্রম করার সাহস।
উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়াতে হবে ধর্ম বা বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক। মানবতার স্বার্থে আমাদের সম্মিলিতভাবে এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে একটি সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Tags :

Juyel Raaj

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025