একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

শুক্রবার দেশটির প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। বর্তমানে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

কংগ্রেসে উত্থাপিত এই প্রস্তাবে প্রস্তাবটিতে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতার নিন্দা, ঘটনাগুলোকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ।

এর পাশাপাশি ১৯৭১ সালের নৃশংসতায় পাকিস্তানকে সহায়তার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়। প্রস্তাবে দলটিকে একটি ‘কট্টরপন্থি ইসলামি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। সে সময় ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর হাতে। বাঙালিদের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক ও দমনমূলক মনোভাব দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান ছিল।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতা ও অনীহা প্রদর্শন করে।

এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে এবং ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানে পরিকল্পিতভাবে নিরীহ বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এই গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া দুই লাখের বেশি নারী ভয়াবহ ধর্ষণের শিকার হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

প্রস্তাবটি পেশ করার সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন “১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চালানো অভিযানটি জাতিসংঘের ‘গণহত্যা’র (genocide) সংজ্ঞার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।”

প্রস্তাবে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী কটরপন্থি ইসলামিক দলগুলো নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করলেও বিশেষভাবে সংখ্যালঘু হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। হত্যা, ধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও বিতাড়নের মাধ্যমে তাদের নির্মূলের পদ্ধতিগত চেষ্টা চালানো হয়।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের ভূমিকার কথা প্রস্তাবে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্চার সে সময় ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় এই ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং ওয়াশিংটনের নীরবতার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত এক বার্তায় তিনি এবং একদল মার্কিন কূটনীতিক নিজ সরকারের নীরবতার কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “এই সংঘাতের ক্ষেত্রে ‘গণহত্যা’ শব্দটিই প্রযোজ্য।”

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো ঘটনাগুলো স্মরণ ও নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের নৃশংসতা প্রতিরোধ করা যায় এবং ভুক্তভোগীদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।

Tags :

International News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025