ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে চালাচ্ছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। আর এই অপারেশনের নামে নির্বিচারে মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ও ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে দুই দফায় চালানো এই অভিযানে ২৭ হাজার ৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশেষ এই অভিযানের পাশাপাশি জুলাই-আগস্ট আন্দোলন পরবর্তীতে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্ট ও অভিযোগের মূলে গ্রেপ্তার হয় ৬০ হাজার।
সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তী এ পর্যন্ত ৫২০ দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৮৭ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন ছাড়াও অন্য দলের কর্মী-সমর্থকদের গ্রেপ্তারের অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, যারা ডেভিল বা যারা প্রকৃত অর্থে অপরাধী তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। দুই দফার ডেভিল হান্ট অভিযানে ২৭ হাজার গ্রেপ্তারের পরও এখনো আমরা খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। ডেভিল হান্টের নামে সাধারণ মানুষ বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হলে সেটা তো যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পন্ন হবে না। সাধারণ মানুষকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা মামলা বাণিজ্যের জন্য যদি গ্রেপ্তার করা হয়, সেটা তো সরকারকে একবার ভেবে দেখতে হবে। এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্রেপ্তার অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই ২২ দিনে অপারেশন ডেভিল হান্টে সারা দেশে ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে এই অভিযান চলমান থাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য দুই দফায় অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের ‘ফ্যাসিস্ট’ পরিচয় ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা হচ্ছে। অনেককে গ্রেপ্তার করে তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসাবে চিহ্নিত করে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সুবিধা করিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে কেউ কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর পাশাপাশি সমর্থকদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কারণ, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা লুটপাট, গুম, খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রায় বেশির ভাগই পালিয়ে গেছে, আত্মগোপন করেছে এবং গ্রেপ্তার হয়েছে। সেক্ষেত্রে নিরপরাধ সমর্থকদের গ্রেপ্তার করা হলে সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে।
এ রকমই গত ২২ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের চুনারুঘাট পৌরসভায় মধ্যবাজার এলাকার সংবাদপত্র বিক্রেতা সত্তোর্ধ্ব রায় রঞ্জন পালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত রায় রঞ্জন পাল চুনারুঘাটে ৫৫ বছর ধরে সংবাদপত্র বিক্রি করেন। এলাকায় তাকে অনেকেই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে মনে করেন। অতীতে তার বিরুদ্ধে থানায় কোনো জিডি নেই। স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কারো সঙ্গে দ্বন্দ্বও নেই। এমন একজন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করায় এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়।
একই দিনে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় শংকর পাল সুমন নামে একজন স্থানীয় সাংবাদিককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। শংকরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থক।
অপরদিকে, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষকেও গ্রেপ্তার করার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীসহ ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা হয়েছে। আবার তথ্য যাচাই-বাছাই না করে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তারের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় অজ্ঞাত আসামির তালিকায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এসব বিষয়ে সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘যারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো বা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যে কোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সর্তক থাকবে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ অভিযানে গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া এ অভিযানে ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৫৪১ রাউন্ড গুলি, ৫৬৬ রাউন্ড কার্তুজ, ১৬৫টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণ ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় মামলা ও ওয়ারেন্টমুলে ১৯ হাজার ২৩৫ জনসহ সর্বমোট ৩৩ হাজার ৮০৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এর আগে গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত ২২ দিনে অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বিভিন্ন পদধারী নেতাকর্মীর পাশাপাশি সমর্থকও রয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক




