অস্থিরতায় সরকার, থেমে নেই দেশবিরোধী চুক্তি

একটা অবৈধ জনবিচ্ছিন্ন নিন্দিত সরকার এত ক্ষমতা পায় কোথায়? জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্বে সেনাদের একাংশ এই সরকারের ‘পাহারাদার’। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট এক ভাষণে ‘দেশের জনগণের দায়িত্ব আমি নিলাম, আমার উপর ভরসা রাখুন’ বলে তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করে ইউনূসের ইন্টেরিমকে আগলে রেখেছেন এক ধরণের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ডেমো দেখিয়ে। ইন্টেরিমের দ্বিতীয় শক্তি-স্টাবলিশমেন্ট। স্টাবলিশমেন্টই মূলত রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রই কার্যত স্টাবলিশমেন্ট। আধুনিক যুগে ‘কাবাল’ পরিচালিত স্টাবলিশমেন্টের ক্ষমতা সাংসদ-মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী এমনকি প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি। এই স্টাবলিশমেন্টে দেশের সকল শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সমাজের ক্ষমতাবান ধনিকশ্রেণীর প্রতিনিধি আছে।

সেই স্টাবলিশমেন্টের একাংশ হঠাৎ করে নিজেদের অনিরাপদ বোধ করছেন। তারা বুঝতে পারছেন গত দেড় বছর ধরে তারা যতো অপরাধ করেছেন তার জবাবদিহির সময় এসেছে গেছে। অন্যায়-অপরাধের কলসি পূর্ণ হলে হয় ভেঙে পড়ে নইলে উপচে পড়ে। দেশের প্রধার দলটিকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে আগামী চারদিন পর যে ‘পাতানো’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে তা যে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, এবং তার ফলে যে জনঅসন্তোষ শুরু হবে, যে এনার্কি শুরু হবে তা সামলাতে পারবেন না।

এ কারণে শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাংশ একের পর এক ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট জমা নিয়ে ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে দেশ ছাড়তে চাইছেন। বিস্ময়করভাবে এই তালিকায় নয় জন উপদেষ্টা, একাধিক রাজনৈতিক নেতা, সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের সমর্থকসহ আইজিপিও আছেন!

এই যে তারা আগাম বিপদের গন্ধ পাচ্ছেন তার পেছনের কারণ কি?

১) গত বছর নভেম্বর মাসে পোর্টের লালদিয়া টার্মিনাল লিজ দেওয়া হয় ডেনমার্কের ‘এপিএম টার্মিনালস’, পানগাঁও দেওয়া হয় সুইজারল্যান্ডের ম্যাডলক এসএ’কে। এর পর নিউমুরিং টার্মিনাল লিজ দেওয়া হচ্ছে দুবাই ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। এর জন্য কোনো টেন্ডার, যাচাই-বাছাই-মতামত কিচ্ছু করা হয়নি। এ যেন পৈত্রিক সম্পত্তি, যখন খুশি যার-তার কাছে লিজ বা বিক্রি করা যায়।

আলোচিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিক সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আফ্রিকার জিবুতিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনার বিরোধ রয়েছে। সেখানে যে শর্তে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছিল, তারা সেটি ভঙ্গ করে। জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সুযোগ দেননি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। রাজনৈতিক চাপে বাধ্য হয়ে তখন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হয় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে।

বিরোধিতা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্ব বিদেশিদের দেয়ার কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। ছবি : ডয়চে ভেলে

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে দায়ের করা রিট খারিজ করেছে হাইকোর্ট। গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতি ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে রূপ নেয়। এই ধর্মঘট গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসে স্থগিত করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৫ শ্রমিক নেতার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তে দুদককে চিঠি দেওয়া হয়। এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারীরা।

রবিবার, ৮ই ফেব্রুয়ারি আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অচলের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। চট্টগ্রাম বন্দরে আবার অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে বাজারে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়বে। বিজিএমইএ নেতারা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো জাহাজীকরণ না হলে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন। ব্যবসায়ীদের বিশাল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হবে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম) জানায়, বর্তমানে বন্দরে আটকা থাকা রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার। তা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলবে। এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল।

) নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ঘানার সাবেক রাষ্ট্রপতি নানা আকুফো-আদ্দোর নেতৃত্বে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের ১১ সদস্য জাপার একাংশেরসঙ্গে বৈঠক করেছন। সেখানে জাপা নির্বাচনে ‘নিরপেক্ষতা নেই’ বলে নালিশ দিয়েছেন। এই দলটি পরে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের তিন নেতা- সজীব ওয়াজেদ জয়, ড. সেলিম মাহমুদ ও জাহানারা আরজুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জয় জানিয়েছেন-সন্ত্রাসদমন আইনে একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা যায় না। এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছেন কমনওয়েলথ টিম।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের মন্তব্য

৩) ৭ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই সরকারের ‘পক্ষের প্রতিষ্ঠান’ সিপিডি এক সেমিনারে বলেছে ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া হলে সে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ হবে না। আওয়ামী লীগকে তো গতকাল নিষিদ্ধ করা হয়নি। ২০২৫ সালের ১২ মে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমস্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সিপিডি সেসব জানে। এমনকি তার আগে থেকেও জানে। প্রশ্ন হলো এতদিন পর নির্বাচনের ঠিক চারদিন আগে কেন সিপিডি এই গুরুতর প্রশ্ন তুলল? তবে কি সিপিডি ভবিষ্যতে রিভেঞ্জ বিভীষিকা অনুমান করতে পারছে?

৪) আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। তারা স্পষ্ট করেই বলেছে-দেশের সিংহভাগ ভোটারের ভোটদানের অধিকার বঞ্চিত করা হলে নির্বাচন সর্বজন গৃহিত হবে না বরং প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

৫) জামায়াতের আমীর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে ‘মিলেমিশে কাজ করা’র আহ্বান রাখেন। বিএনপি জামায়াতের এই প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারি বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাতে বিএনপি কোনোরকম সমঝোতায় যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে করে জাময়াতের চেয়েও বেশি অস্বস্তিতে পড়েছেন সরকারের চার উপদেষ্টা। তারা মনে করছেন ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিএনপির বিরুদ্ধে নানা ধরণের আইনবহির্ভূত অ্যাকশন নিয়েছিলেন তারা। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তো তাদের বিপদ হতে পারে।

৬) উপদেষ্টাদের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি সরকারের মিত্র বলে পরিচিত এনসিপি ও ইনকিলাব মঞ্চের হঠাৎ যুদ্ধংদেহী আচরণের হেতু খুঁজে পাচ্ছেন না। ইনকিলাব মঞ্চের দাবীর প্রতি পুলিশি অ্যাকশন এবং দুদিন বন্ধ রেখে ৮ তারিখে আবার তারা যমুনা ঘেরাও করার কর্মসূচি দেওয়ায় ওই উপদেষ্টাগণের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া হচ্ছে। এতে করে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা জোরালো হচ্ছে।

৭) ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনটি ইস্যু নিয়ে আন্দোলন জোরালো হতে পারে। পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে অগ্নিগর্ভ। (ক) চট্টগ্রাম বন্দরের লিজ নিয়ে আন্দোলন তীব্র হয়ে বন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে। দেশের মোট রফতানির ৯১ শতাংশ হয় এই বন্দর দিয়ে। (খ) সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেল বাস্তবায়ন আন্দোলন জোরালো হচ্ছে। গতকালই পুলিশ তাদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার পর তারা আজ আবার যমুনা অভিমুখি মিছিলের ডাক দিয়েছে। এই আন্দোলনে সচিবালয় ও অন্যান্য সেবাদান প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যোগ দিতে পারে। তালা ঝুলতে পারে সচিবালয়ে। উপদেষ্টাদের অনেকে মনে করেন এমনটা হলে কোনোভাবেও নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।

কয়েকদিন আগে এক উপদেষ্টার সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাদের একটি বৈঠক হয়েছিল। উপদেষ্টা তাদের যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেখান থেকে তিনি সরে এসছেন। নির্বাচনের যখন মাত্র চারদিন বাকি, তখন এই তিনটি বড় ধরনের আন্দোলন, মিটিং-মিছিল-ঘেরাও-অবস্থান কর্মসসূচি সরকারের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এইসব অস্থিরতা দমন করা যে সরকারের পক্ষে সম্ভব না সেটা সরকারের একাধিক উপদেষ্টা, পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন।

এতসব অস্থিরতার মধ্যেও আবার সরকার একটার পর একটা দেশবিরোধী চুক্তি করে চলেছে। চীনের সঙ্গে সামরিক চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে ৫১ টি দেশের প্রতিনিধিদের সম্মেলনে ভারতের সঙ্গে নতুন ১২১ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির পরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ বিষয়ে নিজেরা জড়িত না হয়ে ভারতকে ‘দেখতে’ বলেছে।

বিতর্কীত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ঠিক আগ দিয়ে ‘প্রতিপালিত’ ইনকিলাব মঞ্চ, ‘অনুগত’ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ‘পক্ষের’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ‘ব্যালান্স করা’ কমনওয়েলথ যার যার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ইউনূসের ওপর থেকে। তার বশংবদ উপদেষ্টা গংয়ের অর্ধেকের বেশির পরিবার দেশ ছেড়েছে। তাদের অনেকেই লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে ব্যক্তিগত পাসপোর্টে পশ্চিমা দেশগুলোর ভিসা লাগিয়ে বিমানে ওঠার অপেক্ষা করছে। পুলিশের আইজিসহ বহু কর্মকর্তা নিজেদের সেইফ একজিটের ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মোটের ওপর ইউনূসের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর লোকজনসহ ব্রেড-বাটার খাওয়া বসন্তের কোকিলরা ক্ষমতা পেয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে এখন ভয় পাচ্ছে।

এমতাবস্থায় নিশ্চিতভাবেই ইউনূস ঘরে-বাইরে একা হয়ে পড়েছেন। তার সকল শক্তির উৎসগুলো একে একে নিভে যেতে শুরু করেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তিন গোঁ-ধরে নির্বাচন করতে পারলেও তার মুক্তি নাই, না পারলেও মুক্তি নাই।

ঠিক এমন টালমাটাল অবস্থায় আওয়ামী লীগ যদি তাদের নেতা-কর্মীদের সর্বশক্তি দিয়ে নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘোষণা দেয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই আগুনে ঘি পড়তে যাচ্ছে। জয়ের ভাষ্যে বা শেখ হাসিনার একাধিক অডিও ঘোষণায় তেমন আলামত স্পষ্ট হচ্ছে। এখন কি করবে জামায়াত-বিএনপি-এনসিপি? পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গনের বাস্তবতা শেষ। এখন যেটা হতে পারে-চর্তুমুখি সংঘাত। সেটা এমনই ক্রিটিক্যাল যে পক্ষ-বিপক্ষ অনুসরণ করাও কষ্টকর। একদল প্যারাসাইট দেশটাকে এমন এক অনিশ্চিত অগ্নিগর্ভ করে তুরেছে যেখানে কেউই আর নিরাপদ নয়।

Tags :

Monjurul Haque

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025