এভাবেই কাল্ট বানাতে হয়। এটাই ইনফরমেশনওয়ার-এর স্ট্রাটিজি। একজন ইউনূস জনা বিশেক উপদেষ্টা, শীর্ষ সেনা-পুলিশ কর্মকর্তা, কয়েকশ আমলা আর কয়েক হাজার ইউএসএআইডি’র ডলার গেলা ইন্টেলেকচ্যুয়াল নিয়ে সিআইএ-আইএসআই-এর মদদে ক্ষমতা দখল করে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে টিকতে পারত না, যদি না তার পেছনে প্রায় ১১ কোটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানি আদর্শের জনগোষ্ঠীর মৌন সমর্থন থাকত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতরের (OHCHR) তথ্য মতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তৎক্ষণাৎ সহিংসতায় প্রায় ২৫০ জন, ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (HRSS)-এর তথ্যমতে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১১৯ জন, অন্য একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬৩৭ জন, মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (ASK)-এর হিসাব মতে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২১ জন, এবং প্রায় ৫,০০০ মানুষ আহত, ‘গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স’ (GCDG)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অন্তত ৪৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে মৃত্যু ঘটেছে।
২০২৫ সালের জুনের পর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও অন্তত ১৬০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১শ’র ওপরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো যেন অচল খুচরো পয়সা! পকেটে আছে কিন্তু বিনিময় করা যায় না। এরা যেন মানুষই না! এই মৃত্যুগুলো ডান-বাম-মধ্যডান-মধ্যবাম-প্রগতিশীল-সুশীল-ভাড়াটে ইন্টেলেকচ্যুয়ালদের কাছে পিঁপড়ের মত মৃত্যু, জুতো যার হিসাব রাখে না।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুয়ায়ী ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে অন্তত ৬৩১ জন ছাত্র-জনতা প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৯ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা বলা হচ্ছে প্রায় ১৪০০ জন।
এই মৃত্যুগুলো গেজেটভুক্ত। সরকার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র, এনসিপি, বিএনপি, জামায়াতসহ ডান-বাম সকলেই এই মৃত্যুকে দেশের ইতিহাসের ‘নৃশংসতম’, ‘ভয়াবহ’, ‘পাশবিক’, ‘নারকীয়’ বিশেষণে আখ্যায়িত করে বিগত সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী’, ‘খুনি’ আওয়াজ তুলে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে চলেছেন।
অন্য এক হিসাবে দেশে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-অক্টবর) ২ হাজার ২১৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১১ জনের বেশি মানুষ খুন হয়েছে— সে দেশে একজনের ওপর হামলা কেন এতটা ‘বিশেষ’ হয়ে উঠল?
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে অক্টবর পর্যন্ত দেশে নারী নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম-খুনসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬১০টি। ১৫ মাসে (গত বছরের আগস্ট থেকে) রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মবসন্ত্রাস, ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নদীতে ভেসে আসা অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সংখ্যাও মাসে গড়ে ৪০-৪৫টির কম নয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এক ওসমান হাদির মৃত্যু ওইসব মৃত্যুকে ম্লান করে দিয়েছে। হাদির মৃত্যুকে যারা ‘ক্যাশ’ করতে চাইছেন তারা হাদির মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিশেষ বিশেষ স্থাপনা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে, মবভায়োলেন্স করে অর্ধেক পরিকল্পনা হাসিল করেছেন। আশা করছেন বাকিটাও পারবেন। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী হাদিকে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক’ বলেছেন! বিভিন্ন বেনিফিশিয়ারি মহল থেকে আরও যেসব বিশেষণ এসেছে তাতে মনে হতে পারে বাংলাদেশ তার ‘স্রষ্টা’ বা ‘জাতির ত্রাণকর্তা’ হারিয়েছে। শাহবাগ ‘হাদি চত্তর’ হয়েছে। তাকে বিদ্রোহী কবি নজরুলের কবরের পাশে কবরস্ত করা হয়েছে। দাবী উঠেছে ঢাকার নাম বদলে হাদির নামে রাখার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলও তার নামকরণ হয়েছে। হয়ত আরও অনেক কিছুর নাম বদলে তার নামে করা হবে।
অথচ ১২ ডিসেম্বর আততায়ীর গুলিতে আহত হওয়া এবং ১৮ তারিখে মৃত্যুর পর এতগুলো দিন পরেও সরকার তার খুনিকে ধরতে পারেনি। পাবলিকলি অভিযোগ করিয়েছে-‘হাদির খুনিরা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে’, কিন্তু সরকারিভাবে ভারতে পালানোর খবর ভারতকে জানায়নি এবং খুনিকে ফেরৎ চায়নি। এরই মধ্যে পুলিশের শীর্ষ মহল থেকে বলা হয়েছে-‘খুনির ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কোনও তথ্য তাদের কাছে নেই’। প্রশ্ন উঠবে-সীমান্তে বিজিবি কেন খুনিকে আটকাতে পারেনি? কিংবা কেন সীমান্ত পার হতে দিয়েছে?
চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় বর্তমানে যে কয়টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে তাদের যে কেউ নিহত হলেও হাদির মত রাষ্ট্রীয় অ্যাটেনশন পেতেন না। গতকাল নিহত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আবদুল করিম খন্দকার। একই দিনে সুদানে নিহত ৬ সেনা সদস্যের মরদেহ দেশে এসেছে, তিন দিন আগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক গার্মেন্ট কর্মীকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামক সন্ত্রাসীরা। এই মৃত্যুগুলোতে একটা বিবৃতি দিয়ে সরকার দায় সেরেছে।
আর তাতেই জোরালোভাবে প্রশ্ন ওঠে এইসব মৃত্যু থেকে ওসমান হাদির মৃত্যু কী কারণে ভিন্নতর? একজন সাধারণ সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকে কি কারণে রাতারাতি ‘মসীহা’ বানিয়ে দেওয়া হলো? এর সম্ভাব্য উত্তর-অশ্লীল গালিগালাজ ও তীব্র ভারত-আওয়ামী লীগ বিরোধীতা করে হঠাৎ আলোচনায় আসা হাদি ডিপস্টেট, আইএসআই, সিআইএ, MİT, সিভিকোমিলিটারি এস্টাবলিশমেন্ট ও ঘৃণ্য এক্সট্রিম রাইট উইং পলিটিক্সের collateral damage!




