তারেক রহমান দেশে ফেরায় জামায়াতের আশা ভঙ্গ হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে

ভারতের চাণক্যনীতি-কৌশলের কাছে তারেক রহমান অনেকটা ‘দুগ্ধপোষ্য শিশু’। কেন সে ব্যাখ্যার আগে বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহ দেখে আসা যাক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হওয়া-না হওয়ার সম্ভবনা ফিফটি-ফিফটি। খুব দ্রুতই এই পরিসংখ্যান পরিবর্তীত হচ্ছে। বাংলাদেশের ভালনারেবল পলিটিক্সের যৎসামান্য খবর রাখি তাতে বরাবরই বলে এসেছি-‘ইউনূসের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে না।’ ‘কেন হবে না’ তার পেছনে এবং ‘কেন হবে’ তার পেছনেও শক্তিশালী যুক্তি আছে। আসুন বিস্তারে আলোচনা করা যাকঃ

ইস্যু-আওয়ামী লীগঃ

জুলাই-আগস্ট রেজিম চেঞ্জের স্টেকহোল্ডাররা আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিবাদ’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘খুনি’ তকমা দিয়ে ব্যান করেছে। প্রথমদিকে গণতন্ত্রের মুখোশধারীরা লীগের ব্যান বিষয়ে নৈর্ব্যক্তিক থাকলেও পরে ব্যান উদযাপন করে বুঝিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী কয়েকটি দল বাদে দেশের সকল দল লীগকে ব্যান করিয়ে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার বিজয়োৎসব করছে। লীগ রাজনীতি থেকে বিতাড়িত হয়েছে সেই আনন্দে তাদের নিজেদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত মিনিমাইজ করেছে।

কিন্তু বাগড়া দিয়েছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো। তাদের সাফ কথা-সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ইনক্লুসিভ নির্বাচন হতে হবে। ক্ষমতাচ্যুত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলেও দলটি নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারে না। অধিকন্তু দেশের ৫০% ভোটারের ভোট দেওয়ার অধিকার হরণ করা যায় না।

সুতরাং একদিকে লীগকে নির্বাচন করতে দিলে তাদের বিজয়ী হওয়ার ভীতি, অন্যদিকে তাদেরকে নিষিদ্ধ রেখে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর বাতিল করার বা মেনে না নেওয়ার ভীতি। এই সংকটের আপাতঃ সমাধান-নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখা।

ইস্যু-তারেক রহমানের বিএনপিঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বতভাবে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক-লজিস্টিক-কূটনৈতিক এবং মানিবিক সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখার পরও এদেশের প্রায় নব্বই শতাংশ ধর্মান্ধ মুসলিম জনগোষ্ঠী তীব্র ভারতবিরোধী। ভারত সেটা জানে। তারা আরও জানে আজকের তারেক রহমান ও বিএনপি আগাগোড়া ভারতবিরোধী। বিএনপির তিন টার্মের শাসনামলে বিএনপি তথা তারেক সেটা প্রমাণও করেছে। তার পরও ভারত তারেকের দেশে ফেরার ‘গ্রীণ সিগনাল’ দিয়েছে কেন? এর পেছনেই সেই চাণক্যনীতি।

প্রথমতঃ ভারত তারেক রহমানকে শর্ত দিয়েছে-আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে, শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ‘ক্যাঙ্গারুকোর্ট’ আইসিটির গঠন ও সেই কোর্টের বিচার বাতিল করা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কন্টিনিউ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাদের সঙ্গে ইউনূস রেজিমের করা সকল অন্যায়-অপরাধের বিচার করতে হবে।

তৃতীয়তঃ জামায়াতসহ সকল র‍্যাডিক্যাল ইসলামিস্ট দলগুলো এবং তাদের ছত্রছায়ায় প্রতিপালিত জঙ্গিরা যেন কোনোভাবেও ক্ষমতার অংশ হতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

এই তিনটি অপশন আপাতদৃষ্টিতে তেমন কঠিন মনে না হলেও আত্মঘাতি ও ব্যুমেরাংয়ের মত। আওয়ামী লীগের ১৪ দলের জোট বাদে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ ইসলামিস্ট ও বাম ধারার দলগুলো সকলেই তীব্র ভারতবিরোধী। তাদের একমাত্র নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ড-এন্টিইন্ডিয়া সেন্টিমেন্ট, যা দিয়ে সহজেই ৯০ শতাংশ ধর্মান্ধ ভোটার টানা যায়। বাংলাদেশের অনেক মানুষ কেন ভারতবিরোধী সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

এখন যেহেতু ভোটের বাজারে ভারতপন্থী কেউ নেই, ভারতবিরোধী সকলের হাতে এন্টিইন্ডিয়া ট্রাম্পকার্ড। তাহলে সেই কার্ড দিয়ে কে কাকে ল্যাং মারবে? জামায়াত ভোটার টানতে চাইবে ‘বাংলাদেশকে ভারতের করদ রাজ্য হতে দেব না’ বলে। বিএনপিও ওই একই প্রতিশ্রুতি দেবে। এনসিপিসহ বাকি দলগুলোও বলবে-‘ভারতের চোখে চোখ রেখে দেশ শাসন করব’ বলে। এখন কে কার ভোট কাটবে? গণতন্ত্রফনতন্ত্র, স্বার্বভৌমত্ব টাইপ আর কোনও টুলস তো নেই। অর্থাৎ তাদের একমাত্র নির্বাচনী কৌশল এন্টিইন্ডিয়া। আরও নির্দিষ্ট করে ‘C’ কে পরাভূত করবার জন্য ‘A’ এবং ‘B’র হাতে একই অস্ত্র। তারেক রহমান নির্বাচনে সেই অস্ত্রটিই ব্যবহার করবে যা জামায়াতসহ ইসলামিস্ট দলগুলো মারনাস্ত্র ভেবে ব্যবহার করে জিতবে বলে নিশ্চিত ছিল।

তারেক দেশে ফেরায় এ কাণেই জামাতের আশা ভঙ্গ হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছরে এবারই প্রথম জামায়াত তখ্তে-তাউসে বসার নিশ্চিত সম্ভবনা দেখছিল। এখন সেটাতে বাগড়া দিচ্ছে তারেক তথা বিএনপি।

জামায়াতসহ ইসলামিস্টরা এত সহজে বিএনপিকে ওয়াকওভার দেবে ভাবার কারণ নেই। তাই ধরে নেয়া যায় তাদের ‘ঘেটু পুতুল’ ইউনূস, ‘কওমের ভাই’ সেনাবাহিনীর একাংশ এবং ব্যঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা দেশি-বিদেশি জঙ্গি গ্রুপগুলো অ্যাট এনি কস্ট নির্বাচন হতে দেবে না। যদিও তাদের গায়ের সেঁটে থাকা বামপন্থী নামধারী চেমো উকুনরা ‘যে কোনো মূল্যে নির্বাচন হতে হবে’, ‘দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক গণতন্ত্র আনা হবে’, ‘ইনসাফ কায়েমের জন্য বুলন্দ আওয়াজ তুলুন’ বলে মাঠ গরমের চেষ্টা করবে।

ঠিক এমন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিবেশটাই মুহাম্মদ ইউনূসের দরকার। তিনি নির্বাচন দেওয়ার জন্য আসেননি। এসেছেন তার প্রতি করা বিগত সরকারের ‘অপমান-নিপীড়ন’-এর প্রতিশোধ নিতে, নিজের নতুন নতুন বিজনেস হাব খুলতে, বেশুমার অর্থ আয় করতে এবং তার ম্যানুফ্যাক্চারিং বসদের প্রতিদান পাইয়ে দিতে, যা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তিনি চাপে পড়ে নির্বাচনের তারিখ দিয়েছেন, কিন্তু নিশ্চিত জানেন নতুন সরকার বসলেই তাদের সর্বপ্রথম আঘাত আসবে তার উপর। কোনও বিচক্ষণ ব্যক্তি জেনেশুনে এমন বিপদে পড়তে চাইবেন? নিশ্চিতভাবেই না।

এতেও যদি নির্বাচনী গাড়ি চলতে থাকে, তাহলে চাকা পাংচার বা ফিসপ্লেট তুলে হলেও সেই গাড়িকে লাইসচ্যুত করবে জামায়াতসহ ইসলামিস্ট জঙ্গিরা। এমন এনার্কি ছড়িয়ে দেওয়া হবে যেন সাধারণ মানুষ প্রণভয়ে ভোটের নামও মুখে না আনতে পারে। অর্থাৎ ভোট হচ্ছে না।

আবার এইসব এনার্কি, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, খুন-খারাবি, চরম নৈরাজ্যর পরেও যদি নির্বাচন হচ্ছে মনে হয় তখন অবিশ্বাস্য কোনও মিরাকল ঘটে যেতে পারে! যেমন, জামায়াত ক্ষমতায় যেতে পারছে না বুঝতে পারলে জামায়াত-ইউনূস মিলে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করিয়ে তাদেরকে বিএনপির বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবে। তার আগে লীগের কাছ থেকে ইনডেমনিটি আদায় করে নেবে যেন তারা ইউনূস-জামায়াতের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ না নেয়।

ঢাকার একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরনে আহত ৪ জন। উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ ভবনে এ ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় মাদ্রাসা ভবনটির দেয়ালের একটি অংশ উড়ে্রাসায়

এসব দেখেশুনে বিএনপি যদি দেখে তারেক ফেরার পর তাদের নিশ্চিত বিজয় ছিনিয়ে নিতে চাইছে ইউনূস-জামায়াতগং। তখন বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে অ্যালায়েন্স করে ‘দুই ভাই’ ক্ষমতা ভাগাভাগী করে নেবে। সেটা বুঝে ভারতও ইউনূসকে চাপ দিয়ে লীগকে মাঠে নামার ব্যবস্থা করে দেবে। তখন বিস্ময়করভাবে ইউনূস-আওয়ামী লীগ অ্যালায়েন্স হবে ‘জঙ্গি ঠেকানোর’ কাভারে।

এমনকি এটাও ঘটতে পারে যে বিএনপি-জামায়াত-ইসলামিস্টরা মিলে নির্বাচন করিয়েই ছাড়বে বুঝে ইউনূস লীগকে মাঠে নামিয়ে বহুমুখি সংঘাত বাঁধিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে ২০২৭ সালে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ তিনি আরও একবছর সময় পাবেন ‘জর্জ সোরেস মিনি’ হওয়ার জন্য।

এই সবকিছু ঘটে যে চোলাই পাওয়া যাবে তার কি নাম দেয়া যায় জানি না। তবে আগামী মাসটা হতে চলেছে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ক্রশিয়াল মাস। এ মাসে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। চরম শত্রু মিত্র হয়ে উঠতে পারে, আবার হরিহর মিত্র ডাইরেক্ট শত্রু হয়ে উঠতে পারে। এই সবকিছুর মধ্যে এমন এক সিচ্যুয়েশন ক্রিয়েট হতে পারে যখন এই দলগুলোর অনেকেই বলবে- ‘শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা হোক’। অনলি শী ক্যান ট্যাকল দ্য ট্রিমেন্ডাস আনরেস্ট আনসার্টেনিটি।

নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সুচির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই সামরিক জান্তা ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর লড়াইয়ে বিপর্যস্ত মিয়ানমার। মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেই ডিসেম্বর ২০২৫-এ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দেশটিতে।
Tags :

Monjurul Haque

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025