২০২৫ সালে বাউল সম্প্রদায় থেকে শুরু করে গণসংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং স্বাধীন গবেষণামূলক শিল্পচর্চায় বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংস্কৃতির সর্বক্ষেত্রে এ বছর গভীর ক্ষত রেখে গেছে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে এক শ্রেণির লোক বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা চালায়। গত সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে বাবা শাহ সত্যপীরের মাজারে হামলা হয়।
গত মার্চে বিভিন্ন সংগঠন ও নাগরিক গ্রুপ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। তখন বক্তারা বলেন, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও সৃজনশীলতার বিকাশই জাতীয় চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি। বছরজুড়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দেখা যায়নি উল্লেখযোগ্য কোনো মঞ্চনাটক বা আয়োজন।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে বাউল ফকির নামে পরিচিত বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন আকন্দের মাথার জট জোর করে কেটে দেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক ব্যক্তি হালিম উদ্দিন আকন্দকে ধরে রাখা অবস্থায় জোর করে তাঁর চুল কেটে দিচ্ছে। এ সময় তিনি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস!’ বৃদ্ধ হালিম উদ্দিনের এ স্বগতোক্তি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। ওই ঘটনার পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বর্তমানে তিনি আর বাইরে বের হতে চান না।
মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে অনুগামীদের ওপর হামলার ঘটনা ছিল বেশ আলোচনায়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাউল ও লোকসংগীত শিল্পীদের ওপর হামলা, হুমকি, অনুষ্ঠান বন্ধ ও অপমানজনক আচরণের ঘটনা ঘটে।
শাহবাগে ‘গানের আর্তনাদ’ নামে আয়োজিত বাউল ও লোকসংগীত কর্মসূচিতে হামলার প্রতিবাদমূলক আয়োজন পণ্ড করার ঘটনাও ঘটে। দেশের কয়েকটি স্থানে নাটক মঞ্চায়ন স্থগিত করার ঘটনাও দেখা গেছে।
বছরের শেষে ডিসেম্বরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিবেশ আরও অস্থিতিশীল হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচীর র্কাযালয়ে আগুন দিলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সংগঠনের সবকিছু। কার্যালয়ে ৫৭ বছরের অনেক নথিপত্র ছিল, যেগুলো পুড়ে গেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বেশ কয়েকজন বিদেশি আমন্ত্রিত শিল্পীর কনসার্ট বাতিল করা হয়।
২০২৫ সালে কার্যত সাংস্কৃতিক অঙ্গন ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়। এতে অনেকের মাঝেই উদ্বেগ দেখা যায়। বাউল, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যগত শিল্পের ওপর সহিংস আচরণ, হুমকি, মানসিক উত্তেজনা– সবকিছু স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বছরজুড়ে। তবে প্রতিরোধও দেখা গেছে। বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে।
সূত্র: সমকাল



