বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা যা গড়ে তুলেছিলাম, সব ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতি, সম্প্রীতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা-সবই। যন্ত্রণা হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেখেছি অসাধারণ সাহস। নির্যাতন ও কারাবাসের মধ্যেও আমাদের কর্মীরা বিশ্বাস ছাড়েননি। সাংবাদিকরা ভয় উপেক্ষা করে সত্য লিখেছেন। সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে মুখ খুলেছেন।
ভারতের সংবাদমাধ্যম জি-২৪ ঘণ্টাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন শেখ হাসিনা। এতে তিনি মব-সন্ত্রাস, গণ-গ্রেপ্তার, অর্থনীতির ধসসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন।
ওই সাক্ষাৎকারে দেওয়া শেখ হাসিনার বিভিন্ন মন্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো-
”আমার প্রথম এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে, সংবিধানসম্মত শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ কার্যত আইনের বাইরে চলছে। মব-সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত গ্রেপ্তার, গণহারে আটক-গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজও প্রায় এক লক্ষ বাহান্ন হাজার মানুষ মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি, যাঁদের অনেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার। তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া জরুরি।
এর পাশাপাশি, ইউনূস যে সর্বনাশ করে গিয়েছেন, তা মেরামত করাই আমাদের দায়িত্ব। দ্রুতগতির অর্থনীতি থমকে গিয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। যুবসমাজ, কৃষক ও শ্রমিক-কারও জন্যই কাজ নেই। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি আক্রান্ত, সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দেশে আজ আইনের শাসন নেই, আছে শুধু মব-সন্ত্রাস।
বাংলাদেশের চরমপন্থী শক্তিগুলি, যাদের অনেকের সঙ্গেই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের যোগ রয়েছে, তারা আজ সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রকাশ্যেই তারা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করছে। এই ক্ষত সারাতে হলে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট-সম্পন্ন সরকার দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারে হোক বা বিরোধী দলে- দেশের সেবা করতে প্রস্তুত। কিন্তু নিষিদ্ধ ও নির্যাতিত অবস্থায় সেটা সম্ভব নয়।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি। শক্তিশালী বিরোধিতা শাসনব্যবস্থাকে আরও মজবুত করে।
কিন্তু কিছু বাস্তব সত্য ভুললে চলবে না। তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে স্বচ্ছন্দ নির্বাসনে কাটিয়েছেন সরকারি অর্থ তছরুপে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর। নেতৃত্ব মানে জবাবদিহি ও মাঠে উপস্থিতি, বিদেশে বসে নির্দেশ দেওয়া নয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয়, বিএনপির চরমপন্থী শক্তির সঙ্গে আপস করার দীর্ঘ ইতিহাস। ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে-ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে, হুমকি দিয়ে ভোট আদায় করা হচ্ছে। এটা গণতন্ত্র নয়, এটা জবরদস্তি।
বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, আমি আশা করব তারা আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কখনও সংসদ হতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। আমাদের আমলে সাংবাদিকরা ভয় ছাড়াই লিখেছেন, বিরোধিতাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কারণ সেটাই গণতন্ত্রের চিহ্ন। আজ যিনি কোনও নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় এসেছেন, যাঁর উত্থান রক্তপাত ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে, তাঁর কাছ থেকে হিংসার প্রশংসা অস্বাভাবিক নয়।
আওয়ামী লীগ কোনও পরিবারের সম্পত্তি নয়। এটি লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির দল, যাঁরা ১৯৭১-এর আদর্শে বিশ্বাস করেন। গ্রাম থেকে শহর-দল সর্বত্র প্রোথিত। এই সংকট আমাদের দেখিয়েছে কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, ডিজিটাল যুগ বোঝা, নেতৃত্ব-সবই জরুরি। তরুণদের দাবি একেবারেই যুক্তিসংগত, আমরা তা গুরুত্ব দিয়ে শুনছি। তবে দল নিষিদ্ধ অবস্থায়, হাজার হাজার কর্মী কারাগারে, সদস্য হওয়াই যেখানে অপরাধ, সেখানে প্রকৃত পুনর্গঠন সম্ভব নয়।
দূর থেকে দেখেছি- আমরা যা গড়ে তুলেছিলাম, সব ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতি, সম্প্রীতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা-সবই। যন্ত্রণা হয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে দেখেছি অসাধারণ সাহস। নির্যাতন ও কারাবাসের মধ্যেও আমাদের কর্মীরা বিশ্বাস ছাড়েননি। সাংবাদিকরা ভয় উপেক্ষা করে সত্য লিখেছেন। সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে মুখ খুলেছেন।
এই যোগাযোগই আমাকে শক্তি দেয়। আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়-এটা ১৯৭১-এর স্বপ্ন। ভয় আর দমন দিয়ে সেই স্বপ্ন মুছে ফেলা যায় না। আমি ধৈর্য ধরেছি, কারণ ভয় ও বর্জনের উপর দাঁড়ানো শাসন টেকে না। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত তার মানুষেরই থাকবে।”




