শেখ হাসিনা কি সত্যি বিক্ষোভকারীদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন?

আল-জাজিরায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সঞ্চালক শ্রীনিবাসন জৈন একটি গুরুতর প্রশ্ন নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মুখোমুখি হন।

প্রশ্নটি ছিল একটি ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথন নিয়ে। জয়ের দাবি তাঁর মা কোনো হত্যার হুকুম দেননি। কিন্তু এই ফোন আলাপের রেকর্ড জয়ের দাবির বিপরীত।

জৈন সরাসরি প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন বলেন, আপনার মা কোনো নির্দেশ দেননি, তখন আপনি কি আল-জাজিরার প্রতিবেদন, বিবিসির প্রতিবেদন এবং সেই প্রচারিত রেকর্ডিংগুলোর কথা দেখেছেন—যেখানে শোনা যায়, আপনার মা বলছেন, তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন? তিনি (শেখ হাসিনা) বলেন, “আমার নির্দেশনা দেওয়া আছে ওপেন নির্দেশনা দিয়ে দিছি এখন, এখন লিথাল উইপোন ব্যবহার করবে। যেখানে পাবে সোজা গুলি করবে।”

এর জবাবে সজীব ওয়াজেদ জয় জোরালোভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, আল-জাজিরা ও বিবিসি—দুটিই ওই ক্লিপটির খণ্ডিতাংশ ব্যবহার করেছে, ফলে অর্থ বিকৃত হয়েছে।

জয়ের ভাষায়, ‘তিনি (হাসিনা) বলেন, তিনি বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেন।’

জয় আরও দাবি করেন, তাঁর মায়ের ওই নির্দেশ কেবল ‘সহিংস বিক্ষোভকারী, সশস্ত্র বিক্ষোভকারী ও সন্ত্রাসীদের’ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল।

তাহলে কোন ব্যাখ্যাটি সঠিক?

এই প্রশ্ন কেবল কথার কথা নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অন্তত আংশিকভাবে এই কথাগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তার ওপর নির্ভর করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইসিটির অন্যান্য প্রায় সবগুলো বিচারের জন্যও বিষয়টি খুবই প্রাসঙ্গিক।

কথোপকথন

যে রেকর্ডিংটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেটি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শেখ হাসিনা ও দক্ষিণ ঢাকার সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের মধ্যে হওয়া একটি ফোনালাপ। ফজলে নূর তাপস সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভাতিজা হন।

কথোপকথনের শুরুতে দুজন আওয়ামী লীগ নেতা ‘সন্ত্রাসী’দের দ্বারা সম্পত্তিতে হামলার কথা বলেন। তাপস বলেন, জাতীয় সচিবালয়ে (যেখানে সরকারি মন্ত্রণালয়গুলো রয়েছে) এবং আবাহনী ক্লাবে (আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ সাবেক শাসক দলের ফুটবল ক্লাব) হামলা হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আরও কিছু ‘সংবেদনশীল বাসা বাড়িতে আক্রমণ’ হতে পারে।

এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি সব ধরনের জমায়েত ছত্রভঙ্গ করার ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু তাপস সতর্ক করে বলেন, ‘ওদের’ (প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় তিনি সেই ‘সন্ত্রাসীদের’ বোঝাচ্ছেন) ‘রাতে মনে হয়…আরও অনেক কিছু পরিকল্পনা আছে’। এরপর তিনি জানতে চান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি সেনাবাহিনী নামানোর মতো ‘সর্বোচ্চ পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা বলেছেন কি না।

শেখ হাসিনা বলেন, সেনাবাহিনী নামানোর প্রয়োজন নেই। তবে তিনি জানান, তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সেনাবাহিনী ‘রেডি’ আছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন দিয়ে আকাশ থেকে ছবি তোলা এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার।

এরপর শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ‘সবগুলিকে অ্যারেস্ট করতে নির্দেশ’ দিয়েছেন। তিনি জানান, একাধিক সংস্থাকে বলা হয়েছে—‘যে যেখান থেকে যে কয়টা পারবা ধইরা ফেলো।’ এরপর তাপস বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁদের জানিয়েছেন যে ‘ওরা’ এখন মোহাম্মদপুর থানার দিকে এগোচ্ছে।

এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে র‍্যাব পাঠানো হোক। ঠিক এই জায়গাতেই তিনি সেই বহুল আলোচিত কথাগুলো বলেন, ‘আমার নির্দেশনা দেওয়া আছে ওপেন নির্দেশনা দিয়ে দিছি এখন, এখন লিথাল উইপোন ব্যবহার করবে। যেখানে পাবে সোজা গুলি করবে।’

এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর আগে তিনি এমন নির্দেশ দেননি, তিনি ‘এতদিন বাধা দিয়ে রাখছিলাম’ এবং তিনি ‘ওই যে স্টুডেন্টরা ছিল ওদের সেফটির কথা চিন্তা’ করেছেন।’ এতে তাপস বলেন, ‘না রাতে… রাতে স্টুডেন্ট না… রাতে হলো ওরা সন্ত্রাসী।’

এরপর শেখ হাসিনা আবার অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির কথা বলতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় আগুন… বিআরটি বিটিআরসি বন্ধ করে দিছে, পোড়াইয়া দিছে, বিটিভি পোড়াইয়া দিছে… এখনতো ইন্টারনেট বন্ধ সব পোড়াইয়া দিছে, এখন চলবে কীভাবে?’

কথোপকথনের শেষ দিকে তাপস সতর্ক করেন যে, ‘ওরা রাতে মনে হয় আরও ব্যাপক আক্রমণ করবে।’ শেখ হাসিনা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অফিসে আগুন দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। আর তাপস বলেন, বনানী বা গুলশানেও হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য থাকতে পারে।

ব্যাখ্যা

যদি ফোনালাপটি আলাদা করে, পুরো প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে (সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্তির মতো করে) এভাবে ব্যাখ্যা করা অযৌক্তিক নয় যে শেখ হাসিনা এখানে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের যে অনুমতির কথা বলেছেন, তা মূলত অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তির ওপর সহিংস হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য ছিল, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের জন্য নয়।

কারণ, ওই বক্তব্য দেওয়ার আগে পুরো কথোপকথনের মূল বিষয় ছিল বিভিন্ন ভবনে হামলা। প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশের ঠিক আগমুহূর্তে তাপস বলেছিলেন, ‘ওরা’—যার মাধ্যমে সেই ‘সন্ত্রাসী’ বোঝানো হচ্ছে বলে মনে হয়—মোহাম্মদপুর থানার দিকে এগোচ্ছে। এতে একটি সহিংস হামলার আশঙ্কার ইঙ্গিত, এমন বোঝাতে চাচ্ছিলেন তাপস, তেমনই মনে হয়।

এ ছাড়া প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতির কথা বলার ঠিক পরেই শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আগে এমন নির্দেশ দেননি, কারণ তিনি ‘ছাত্রদের নিরাপত্তার কথা ভেবে’ এত দিন নিজেকে সংযত রেখেছিলেন।

এতে বোঝা যায়, অন্তত এই ফোনালাপে তিনি যেভাবে ভাষা চয়ন করেছেন তাতে সচেতনভাবেই ‘ছাত্র’ ও ‘সন্ত্রাসী’—এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য করছিলেন।

তবে আরেকটি ব্যাখ্যাও সম্ভব। ফোনালাপের মাঝামাঝি অংশে যখন শেখ হাসিনা ও তাপস নজরদারি ও গণগ্রেপ্তার নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁরা হয়তো শুধু সন্ত্রাসীদের নয়, বরং বিক্ষোভকারীদের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর কথাও বলছিলেন।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পরে যখন শেখ হাসিনা ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের নির্দেশের কথা বলেন, তখন তিনি কেবল সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের নয়, বরং এই বড় গোষ্ঠীটিকেই বোঝাতে পারেন।

এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এটি তুলনামূলকভাবে কম গ্রহণযোগ্য; বিশেষ করে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের কথা বলার পরপরই ‘ছাত্রদের নিরাপত্তা’ নিয়ে তার মন্তব্যের আলোকে এটি কম গ্রহণযোগ্য।

সুতরাং, এই সীমিত বা সংকীর্ণ ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা যায়, সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি আছে: শুধু এই রেকর্ডিংটিকে ধরে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায় না যে শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এ কারণে, বিবিসি ও আল-জাজিরার তথ্যচিত্রগুলো কিছুটা বিভ্রান্তিকর হয়েছে, কারণ সেগুলোতে শেখ হাসিনা এই মন্তব্য কোনো প্রেক্ষাপটে করেছিলেন, তা যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি , এবং এমন বোঝানো হয়েছে যে তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন এই ফোন আলাপে।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

তবে ফোনালাপটির এই ব্যাখ্যা মেনে নিলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন যে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো শেখ হাসিনার নির্দেশের প্রকৃত ব্যাপ্তি ও প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইজিপি আদালতকে জানান, ১৮ জুলাই, অর্থাৎ যেদিন শেখ হাসিনা ও তাপসের মধ্যে ফোনালাপটি হয়েছিল, সেই দিনই শেখ হাসিনা বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তিনি আদালতে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আমাকে ফোন করে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলন দমনের জন্য সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সে সময় আমি পুলিশ সদর দপ্তরে ছিলাম এবং অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় জোয়ারদার আমার সামনেই উপস্থিত ছিলেন। আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশ প্রলয় জোয়ারদারকে জানাই, তখন তিনি আমার কক্ষ থেকে বের হয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ সারা দেশে এই নির্দেশ পৌঁছে দেন। এই নির্দেশটি দেওয়া হয় ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে এবং ওই দিন থেকেই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়।’

দেখা যাচ্ছে, আইজিপি সম্ভবত সেই একই অনুমতির কথাই বলছেন যার উল্লেখ শেখ হাসিনা তাঁর ফোনালাপে করেছিলেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো এই অনুমতি দেওয়ার আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে শুধু একজন ছাত্র আন্দোলনকারী আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছিল। ওই দিনের বাকি মৃত্যুগুলো পুলিশের কারণে নয়, বরং আওয়ামী লীগ কর্মীদের আক্রমণে ঘটেছে বলে মনে হয়। কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের পর সবকিছু বদলে যায়। ধারণা করা যায়, নতুন নীতি অনুমোদনের পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন সেদিন।

এরপর ১৯ জুলাই প্রায় ২০০ জন নিহত হন, ২০ জুলাই ৭০ জনের বেশি মানুষ প্রাণঘাতী আঘাতে মারা যান এবং ২১ জুলাই ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

শুধু তাপসের সঙ্গে এই ফোনালাপটি বিবেচনায় নিলে শেখ হাসিনা ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি স্পষ্ট হয় না। কিন্তু ফোনালাপের বাইরে যেসব প্রমাণ আছে, সেগুলো শক্তভাবে বোঝায় যে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ তাঁর সিদ্ধান্তের মধ্যেই ছিল।

এমনকি যদি শেখ হাসিনাকে সুবিধা দিয়েও ধরা হয় এবং বলা হয় যে তিনি কেবল ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধেই এই নির্দেশ দিতে চেয়েছিলেন (যেমনটি জয় দাবি করেন), তবু বাস্তবে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী এই নির্দেশকে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ভুল সংশোধন করতে বা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে সংযত রাখতে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই।

লেখক: ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025