আজ শেষ হতে চাওয়া ২০২৫ সালে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময় দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন তিন জন সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত মানবাধিকার সম্পর্কিত সংবাদ এবং আসকের পর্যবেক্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আইনি নিপীড়নের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক ধারায় পৌঁছেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য জানার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হলেও, চলতি বছরে গণমাধ্যমকর্মীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকরা রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের নিপীড়নের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, যা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করেছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকির শিকার হন অন্তত ২৩ জন। প্রাণনাশের হুমকি পান ২০ সাংবাদিক। প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতকে কেন্দ্র করে মামলার সম্মুখীন হন কমপক্ষে ১২৩ জন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি হামলার শিকার হন ১১৮ সাংবাদিক। এ সময়কালে দুর্বৃত্তদের দ্বারা হত্যার শিকার হন তিন জন এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে চার জন সাংবাদিকের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার সাংবাদিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকায় ৯২ জন, চট্রগ্রামে ৫৩ জন, গাজীপুরে ২০ জন, রংপুরে ২১ জন, কুমিল্লায় ২১ জন এবং বরিশালে ১২ জন সাংবাদিক রয়েছেন। বাকি ১৬২ জন অন্যান্য জেলার কর্মরত রয়েছেন।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি নিপীড়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো সাংবাদিক আনিস আলমগীরের গ্রেফতার। তাকে রাতভর ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে আটক রাখার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। আদালতে হাজির করার পর পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় আনিস আলমগীরকে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোতে ‘আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার প্রোপাগান্ডা’ চালিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা করছিলেন। এই গ্রেফতারের পর সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিক পরিসরে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার বার্তাই কি এ ঘটনায় দেওয়া হলো? আসক এই গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ করে একে ভিন্নমত দমনের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের ৭ ডিসেম্বর আরেকটি আলোচিত ঘটনা জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক শওকত মাহমুদকে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ হেফাজতে নেয়। রাজধানীর মালিবাগ এলাকা থেকে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় বলে ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে জানানো হয়, সেপ্টেম্বর মাসে রমনা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। শওকত মাহমুদ একজন সাংবাদিক হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি হওয়ায়, তার গ্রেফতার নিয়েও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসূত্রের বরাত দিয়ে আসকের প্রতিবদনে বলা হয়েছে, এ বছরে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার কার্যালয়ে ২৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে, সাংবাদিকদের থেকে প্রশ্ন আসে, মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে আয়োজিত বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রার ইউনেস্কো স্বীকৃতি, শোভাযাত্রায় বিগত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর মুখাকৃতির আদলে মুখোশ এবং জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে। প্রশ্নোত্তরের এই পর্ব অনেকটা বাহাসে পরিণত হয়। এ ঘটনার পর একটি ফেসবুক পেজে সংবাদ সম্মেলনের প্রশ্ন ঘিরে তিন টেলিভিশন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়াও ওই পেজ থেকে আরেকটি পোস্ট করে বলা হয় এই তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে ‘মার্চ টু দীপ্ত টিভি, চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা’। এর পরপরই তিন সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানা যাচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রাজশাহীতে দায়ের হওয়া ৩২টি ফৌজদারি মামলায় অন্তত ১৩৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনেও মামলা করা হয়েছে। অথচ গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল বলে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবাদ বেরিয়েছিল। কমিটি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হয়রানিমূলক মামলা পর্যবেক্ষণ করবে এবং সময়ে সময়ে মামলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে। অথচ কমিটি গঠনের পরেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হতে দেখা যায়।
এ ঘটনাগুলো একত্রে নির্দেশ করে যে, ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও আইনি নিপীড়ন ছিল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত প্রবণতার অংশ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সাংবাদিকদের হয়রানি গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক শাসনের জন্য সরাসরি হুমকি। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জনস্বার্থে সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং ভিন্নমতের প্রতি রাষ্ট্রের সহনশীলতা নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।




