একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি আর নেই। ভারতের নয়াদিল্লির সাকেত এলাকার ম্যাক্স হাসপাতালে রবিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
বিবিসি নিউজ হিন্দি রবিবার জানিয়েছে, মার্ক টালির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার সাবেক সহকর্মী ও প্রবীণ সাংবাদিক সতীশ জ্যাকব। তিনি জানান, বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ থাকা মার্ক টালি গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্ক টালি ছিলেন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা। ওই উত্তাল দিনগুলোতে বিবিসি রেডিওতে তার কণ্ঠ শোনার জন্য সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে কান পেতে থাকত বাংলাদেশের মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, বাঙালির দুর্দশা ও যুদ্ধের বাস্তব চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন বিশ্ববাসীর সামনে।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অভিযানের সাক্ষী ছিলেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। পরে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হলেও সীমান্তবর্তী শরণার্থীশিবির ও বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের খবর পাঠাতেন তিনি। তার পাঠানো সংবাদ বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখে।
এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০১২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। সে বছর তিনি ঢাকায় এসে সোনারগাঁও হোটেলে ‘স্মৃতি ৭১’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ওই অনুষ্ঠানে আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং-এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা শোনান তিনি।
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া মার্ক টালির শৈশব কেটেছে ভারতে। ৯ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে সেখানেই পড়াশোনা করেন। শুরুতে সেনাবাহিনীতেও যোগ দিয়েছিলেন মার্ক টালি। কিন্তু ভালো না লাগায় তা ছেড়ে দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে। সেখানেও বেশিদিন থাকা হয়নি তার। পড়াশোনা শেষ না করে শেষে যুক্ত হন সাংবাদিকতায়।
১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দিয়ে পরের বছর নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব নেন। বিবিসিতে প্রায় ৩০ বছরের কর্মজীবনে টানা ২০ বছর দিল্লি ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁর কণ্ঠস্বর পরিচিত ছিল বিবিসিরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে—যার কারণে তিনি পরিচিত হন বিবিসির ‘ভয়েস অব ইন্ডিয়া’ নামে।
মার্ক টালির স্ত্রী মার্গারেট ও চার সন্তান লন্ডনে থাকলেও তিনি নিজে ভারতে থাকতেন।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডসহ উপমহাদেশের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ও সংবাদদাতা ছিলেন তিনি।
সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ভারত সরকার ১৯৯২ সালে তাকে পদ্মশ্রী এবং ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করে। আর নিজের দেশ ব্রিটেন ২০০২ সালে তাকে নাইট উপাধি দেওয়া হয়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন তিনি।
তার প্রথম বই ছিল আমরিতসার: মিসেস গান্ধিস লাস্ট ব্যাটেল। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সংঘটিত অপারেশন ব্লু স্টার, শিখ বিদ্রোহীদের দমনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে এ বইয়ে।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’ বইটিকে টালির অন্যতম সেরা বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া রাজ টু রাজিভ, হার্ট অফ ইন্ডিয়াসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত বই লিখেছেন তিনি।
বিবিসি লিখেছে, “মার্ক টালি ছিলেন “শান্ত, কর্তৃত্বপূর্ণ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সাংবাদিকতার প্রতীক।” দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।
একাত্তরের সেই দুঃসময়ে যাঁর কণ্ঠ ছিল বাঙালির সাহস আর সত্যের ভাষা—বাংলাদেশের সেই অকৃত্রিম বন্ধু স্যার মার্ক টালি চলে গেলেন, রেখে গেলেন সাহসী সাংবাদিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।




