২০২৫ সালে দেশে নানাবিধ সহিংসতার প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজস্ব তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত এক বার্ষিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি এসব তথ্য তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সংঘাত, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখলকে কেন্দ্র করে মোট ৯১৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থী দলের ১ জন রয়েছেন।
এ ছাড়া এসব সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৫১১ জন। পাশাপাশি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।
আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১১ হাজার ৯৩৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরো ৪২ হাজার ৫২৩ জনকে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মামলা ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে গত এক বছরে ৫০ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। একই সময়ে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের অন্তত ৪৭ জন সদস্যকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দেশে মব সহিংসতা বা গণপিটুনির ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্ম অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।’
তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরে অবনতির দিকে যেতে পারে।’
বক্তব্যের শেষে তিনি সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে মানবাধিকার সুরক্ষায় আরো সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।




