মেলেনি প্যারোলে মুক্তি, কারাফটকে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখলেন ছাত্রলীগ নেতা

স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুসন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি মেলেনি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের। এ কারণে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে শেষবারের মতো স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলায় যশোর কারাগারে বন্দী রয়েছেন। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সাদ্দামের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারাফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে মিনিট পাঁচেক সময় দেওয়া হয় সাদ্দামকে।

এর আগে গতকাল শুক্রবার বিকালে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রাম থেকে বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর (২২) ঝুলন্ত লাশ এবং তাঁর ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ ও নিহতের পরিবারের দাবি, হতাশাগ্রস্ত হয়ে শিশুসন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন স্বর্ণালী। পুলিশ জানায়, তারা সুবর্ণা স্বর্ণালীকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ঝুলে থাকা অবস্থায় এবং ছেলেকে মেঝে থেকে উদ্ধার করেছে।

শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে সাদ্দামের স্বজনেরা কারাফটকে আসেন। তাঁদের সঙ্গে দুটি মাইক্রোবাসে ১২ থেকে ১৫ জন স্বজন আসেন। সব কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ছয়জন পরিবারের সদস্যসহ লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কারাগারে প্রবেশের অনুমতি পায়। পাঁচ মিনিট পর তাদের বের করে দেওয়া হয়।

সাদ্দামের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী বলেন, ‘সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর আমরা কারাগারে যোগাযোগ করি। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তিনি তো মার্ডার মামলার আসামি না। রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন। মুক্তি না পাওয়ায় আমরা অনেকেই এসেছি কারাগারে। কিন্তু ছয়জনের বেশি প্রবেশ করতে দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। মানবিক দিক থেকে আজ প্যারোলে মুক্তি দেওয়া উচিত ছিল।’

সাদ্দামের স্বজনেরা জানান, প্রশাসন মুক্তি না দেওয়ায় বাগেরহাট থেকে যশোরে এসেছি। সড়কও খারাপ।

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহমেদ বলেন, ‘কারাফটকে লাশ নিয়ে আসার পর আমরা ছয়জনকে প্রবেশ করতে দিই। পাঁচ মিনিট সাদ্দাম তাঁর মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে পেরেছেন। সাধারণত অনুমতি না নিলেও কোনো কারাবন্দীর স্বজন মারা গেলে, তাঁর লাশ যদি কারাফটকে আনেন স্বজনেরা, তাহলে আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করি দেখতে দিই।’

এদিকে এ ঘটনায় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) নিহত কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর বাবা রুহুল আমিন হাওলাদার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বাগেরহাট সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন।

প্রশাসনের ব্যাখ্যা

বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির আবেদন সংক্রান্ত সংবাদে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে যশোর জেলা প্রশাসন। রবিবার জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার আশীষ কুমার দাস স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্যারোলে মুক্তির আবেদন বিষয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

মিডিয়া সেলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাগেরহাট কারাগার থেকে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সাদ্দামকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনো ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেল গেটে লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উল্লিখিত বন্দির স্ত্রীকে লিখিত চিঠি, কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছবি দেখা যাচ্ছে, যা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এছাড়া আবেদনের পরেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা; কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত কোনো আবেদনই করা হয়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নিন্দা

জুয়েল হাসান সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার ঘটনাকে নাগরিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতিতে আসক বলেছে, জুয়েল হাসান সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে কেবল কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ঘটনাকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে মনে করছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের-অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী; অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রদান করে; ৩৫(৫) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না। একজন বিচারাধীন বন্দী হিসেবে জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। অথচ তার স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে, যা সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।

এতে বলা হয়, প্যারোলে মুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে- ভিআইপি বা অন্যান্য সকল শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দিদের নিকটাত্মীয়ের যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততি এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। এই নীতিমালা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা ইচ্ছামতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়। এই ক্ষেত্রে পরিবার কর্তৃক আবেদন জানানো সত্ত্বেও ওই বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনেও এই বিষয়ক অধিকার সুরক্ষিত। বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) এর রাষ্ট্রপক্ষ, তার অনুচ্ছেদ ৭-এ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে; অনুচ্ছেদ ১০(১) এ বলা হয়েছে, স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে হবে। কারাফটকে পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা, আইসিসিপিআর এর উল্লিখিত ধারাসমূহের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিবৃতিতে বলা হয়, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)মনে করে, কোন আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, তা জানার অধিকার দেশের নাগরিকদের রয়েছে। আইনের শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়; সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা একটি সংবিধানস্বীকৃত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি অপরিহার্য। পাশাপাশি, মহামান্য উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025