ভোট বর্জন করেছেন ৯৩ শতাংশ কারাবন্দি

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারাবন্দিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এই উদ্যোগ নজিরবিহীন হলেও ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে বন্দিদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। সারা দেশে প্রায় ৮৫ হাজার বন্দির মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন মাত্র ৪ হাজার ৫৩৮ জন, যা মোট বন্দির প্রায় সাত শতাংশ। ফলে কারাগারে ভোটের সুযোগ থাকলেও ৯৩ শতাংশ বন্দি ভোটদানে অংশ নেননি।

কারাগারে থাকা নিবন্ধিত বন্দিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে বন্দিদের অনেকেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী হওয়ায় ভোটে অংশ নেননি বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা। আর এনআইডি কার্ড না থাকাসহ দুটি কারণে বন্দিদের নিবন্ধনসহ ভোটে অংশগ্রহণ কম বলে দাবি করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কারা অধিদপ্তর শনিবার সন্ধ্যায় জানায়, কারাগারে গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশেষ এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়। শনিবার পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৪০ জন নিবন্ধিত বন্দির মধ্যে ৪ হাজার ৫৩৮ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ৫২১ জন, পরদিন ৯৮৮ জন, ৫ ফেব্রুয়ারি ১ হাজার ১৩৮ জন, ৬ ফেব্রুয়ারি ৪২০ ও গত শনিবার ৪৭১ বন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। শনিবার ছিল এ ভোটগ্রহণের শেষ দিন।

তবে নিবন্ধিত বাকি ১ হাজার ৪০২ জন বন্দিকে সুযোগ দিতে আরও এক দিন ভোটগ্রহণের সময় বৃদ্ধি করা হয়। রেবিবারও চলে বিশেষ এই ভোটগ্রহণ।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, দেশের ৭৫টি কারাগারে ৮৫ হাজার বন্দির মধ্যে ছয় হাজার ৩১৩ জন নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ আবেদন বাতিল করে বৈধ নিবন্ধন দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৯৪০ জন। শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারের ৪ হাজার ৫৩৮ বন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। নিবন্ধিত বাকিদের ভোটগ্রহণের জন্য আরও এক দিন (রোববার) সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ভিআইপি আসামি কারা ভোট দিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, ভোট দিতে ৩৯ জন ভিআইপি বন্দি নিবন্ধন করেছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুসহ ২২ জন রাজনৈতিক নেতা, ১১ জন সাবেক সচিব, পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা ও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তারা নিবন্ধন করলেও ভোট দিয়েছেন কি না, এ তথ্য আমাদের জানা নেই। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যাচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, জুনাইদ আহমেদসহ অনেক ভিআইপি বন্দি ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন বা ভোট দিয়েছেন, যা সত্য নয়। এমন তথ্য আমরা দিইনি। তারা নিবন্ধনও করেননি।

কারাবন্দিদের ভোটের উদ্যোগে সাড়া কমের কারণ জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের এ সহকারী মহাপরিদর্শক জানান, দুটি কারণে তাদের সাড়া কম বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। প্রথমত, অনেকের কাছে এনআইডি কার্ড নেই বলে আবেদন করেনি। আরেকটি হলো, কারাগারে ভোটের জন্য নিবন্ধন করলে বাইরে বের হলে তারা ভোট দিতে পারবেন না। এটা ভেবে অনেক বন্দি নিবন্ধন করেননি। কারণ অনেকে মনে করেছেন, ভোটের আগে জামিন পেয়ে যাবেন।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বন্দিদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নেই। ফলে তাদের নেতাকর্মীরাও ভোটে অংশ নেননি। এমনটা জানালেন আওয়ামীপন্থি আসামিদের আইনজীবীরাও।

সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ঢাবি ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকতসহ আওয়ামী লীগের শতাধিক আসামির আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে হতে চলা এ নির্বাচনে মানুষের আগ্রহ কম। কারাগারে অনেক আসামি আওয়ামী লীগের, এ কথা সত্য। তারা কাকে ভোট দেবে? এ ছাড়া কারাগারের সব আসামি তো আওয়ামী লীগের নয়। সাধারণ মানুষেরও ভোটে আগ্রহ কম।

নির্বাচন কমিশনের অ্যাপে কারা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বন্দিরা তিন সপ্তাহ ধরে অনলাইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ৫ জানুয়ারি এই নিবন্ধন শেষ হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025