ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে স্বাভাবিকভাবেই এর অব্যবহিত পর পরই নতুন সরকার গঠন হয়ে যাওয়ার কথা। এর ভিন্ন কিছু হয়ে যাওয়াও যে সম্ভব—এবার সেটা নিয়ে কথা বলব। যদিও বলছি না, এমনটাই ঘটবে; যদিও বলছি না নতুন সরকার গঠন হতে হতে আরও ছয়-নয় মাস চলে যাবে; তবে বলছি এর পথ খুলে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে এবং এমনটা ঘটতে পারে, যদি গণভোটে যদি “হ্যাঁ” জেতে। বলছি, “হ্যাঁ” জিতলে ২০২৬ সালের পুরোটাই থাকা সম্ভব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।
স্মরণ করে দেখুন, দুই সপ্তাহ আগে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং মার্চে মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের একটা তথ্য দিয়েছিল। প্রেস উইংয়ের এই তথ্য প্রকাশের পর অনেকেই বলছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে মার্চে কীভাবে প্রধান উপদেষ্টার বিদেশ সফর এবং এই তথ্য কেন এখন জানাবে প্রেস উইং, কারণ তখন স্বাভাবিকভাবে তার সরকারপ্রধান থাকার কথা না। ক্ষমতায় আসবে নতুন সরকার।
এর কিছু উত্তর আছে; এবং ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলেও মার্চে সরকারপ্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফর সম্ভব। এবার দেখি সেটা।
নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে হয়ে গেলে একটা নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ চলে যাওয়ার তো কথা। কিন্তু সেটা হবে কিনা—এ নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। বিশেষত গণভোটে যদি “হ্যাঁ” জিতে যায়।
খেয়াল করুন “হ্যাঁ” ভোটের পরের ধাপগুলো:
১. জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন।
২. এটা বাস্তবায়নে গঠিত হবে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ।
৩. সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা। তারা একইসঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে থাকবেন।
৪. তারা পরিষদের সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচিত করবেন। খেয়াল করে দেখুন, এখানে নতুন জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়া। [দেখুন: জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ১০। ১ ও ২ ধারা]
৫. জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের একটা সময়সীমা রয়েছে। এটা “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন শুরু থেকে ৯ মাস অর্থাৎ ২৭০ দিন পর্যন্ত। [বাস্তবায়ন আদেশের ৮।(গ)]
৬. বাস্তবায়ন আদেশের ৮। (ঙ) পরিষদ দফা (গ) এ উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে উহার কার্য সম্পন্ন করিতে ব্যর্থ হইলে সংবিধান সংস্কার বিল পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে এবং তাহা সংবিধান সংস্কার আইনরূপে কার্যকর হইবে।
গণভোটে “হ্যাঁ” জয়ের পরের ধাপ এগুলো। এই সময়ে এমপিরা শপথ নিলেও নির্বাচিত সরকার কি গঠিত হবে—এই প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। সরকার নাকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোটের আলোকে সংবিধান সংশোধনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে, তবেই কি বিদায় নেবে—এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এ-ক্ষেত্রে আরও একটা তথ্য স্মরণ করিয়ে দিই, গত ১১ জানুয়ারি উপ-প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রধান উপদেষ্টা মূলত তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে মনোযোগ দেবেন। ডিজিটাল হেলথকেয়ার, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি ও সামাজিক ব্যবসা ও উন্নয়ন।
এর অর্থ কী দাঁড়ায়? নির্বাচনের পরেও আমরা ভাবছি সরকারের মেয়াদ শেষ, নতুন সরকারের শুরু; কিন্তু আজাদ মজুমদারের বক্তব্যে বুঝা যাচ্ছে এর পরেও সরকারের হাতে অনেক কাজ আছে।
এবার উত্তর কি মিলল? ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ গণভোটের ফলের ভিত্তিতে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ। ওখানে যদি “হ্যাঁ” জেতে, তাহলে তাদের মেয়াদ আরও ৯ মাস বা ২৭০ দিন বর্ধিত হওয়ার পথ খুলে গেল। ভাবছেন, এসব তো সংবিধান, কোনো আইন, কোনো বিধিবিধানে উল্লেখ নাই; তাহলে কীভাবে সম্ভব? সম্ভব সেভাবেই যেভাবে সংবিধানে না-থাকা গণভোটের আয়োজন হলো; সম্ভব সেভাবে যেভাবে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের নামে হচ্ছে সব।
এটা তো এরিমধ্যে বুঝে গেছেন—নির্বাচিত সরকারের হাতে জুলাই সনদকে ছেড়ে দেবে না সরকার। গণভোটে “হ্যাঁ” জিতিয়ে তারা নিজেরা এটা বাস্তবায়ন করে, তবেই ছাড়বে ক্ষমতা। সরকার ভালোভাবেই জানে, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ হচ্ছে অস্থায়ী আইন, এবং সংসদ এটা পাশ না করলে অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তারা কোনোকিছুই অন্যের হাতে ছাড়বে বলে মনে হয় না। এখানে যেখানে যত সাংবিধানিক সংকটের বিষয় আসবে, ততবারই তারা দ্বারস্থ হবে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের।
সরকারের মেয়াদ যদি দীর্ঘায়ত হয়, তবে মানবে না জনগণ— অনেকেই হয়ত এটা বলবেন। কিন্তু এই যুক্তি মেনে নেওয়ার কারণ আমি দেখি না। কারণ নির্বাচনে জিতবে কোন একটা পক্ষ; হয় বিএনপি, না-হয় জামায়াত-এনসিপি জোট। এখানে মনে রাখা দরকার যারা হারবে সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরে তারাই অনাগ্রহ দেখাবে। গত দেড় বছরের দেশ শাসনে অন্তত এটা সরকার বুঝতে পেরেছে দেশের ক্রিয়াশীল কোন রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা নেই তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার। ফলে এখানে গণভোটের ফলাফলের আলোকে বিশেষ করে “হ্যাঁ” জিতলে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের নামে আরও ৯ মাসের দেশ শাসনের সুযোগ তাদের সামনে এসে যাবে।
এখানে আবার জিতে যাওয়া পক্ষও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য হিসেবে বিবিধ সুবিধা উপভোগের কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেশশাসনে বাগড়া দেবে বলেও মনে হচ্ছে না। সংস্কারের নামে এতদিন অপেক্ষা করা যখন গেলই, তখন না-হয় আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করা ছাড়া উপায়ও নেই তাদের!
ক্ষমতা হস্তান্তরে তালবাহানা অথবা দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নেওয়ার কারণ আছে। এর প্রধান কারণ “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫” নামে যে আদেশ প্রণীত হয়েছে, তাতে কোন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছিল না। এটা ছিল সরকারের একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত।
আবারও স্মৃতি হাতড়াতে বলি—গত বছরের অক্টোবরে “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫”-এর অঙ্গীকারনামায় সই হয়ে যাওয়ার পর এনসিপি এর আইনি ভিত্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। জামায়াতও এতে সায় দিয়েছিল। বিএনপি বলেছিল, নির্বাচিত সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। এনসিপি ছিল নাছোড়বান্দা। এরপর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছিল। কোন দল এখানে এগিয়ে না-আসার পর সরকার ১৩ নভেম্বর বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে। এনসিপি-জামায়াত ও তাদের শরিকরা বাদে অধিকাংশের মতামত ছিল এটা সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের সিদ্ধান্তের বাইরে অন্য কিছু প্রতিপালনে রাজনৈতিক দলগুলোর বাধ্যবাধকতা নেই। বাস্তবায়ন আদেশের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার সেই ভাষণের পর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া সরকারের জন্যে ইতিবাচক ছিল না। এখানে সরকারের আশঙ্কা জন্মেছে যে, এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না কেউ। আর যারা করতে চায়, ভোটে জিতে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এজন্যে গণভোটে “হ্যাঁ” জিতিয়ে সংসদের সমান্তরালে একটা পৃথক পরিষদ গঠন করে, সংসদের ক্ষমতাকে খর্ব করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাইবে এমন একটা ব্যবস্থা, যেখানে চাইলেও নির্বাচিত সরকার যেন হাত না-দিতে পারে। আমার আশঙ্কা তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন মানে, ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার নয়; নতুন সরকার হলেও সরকারের সমান্তরালে আরেক সরকার গঠন করে জুলাই সনদ দিয়ে সংবিধানকে সংশোধন করে ফেলা!
গণভোটে “হ্যাঁ”-এর জয় এই অনিশ্চয়তা পথ খুলে দেবে বলে আমার আশঙ্কা। এটাই যে শেষ কথা এমনটা বলছি না, তবু আশঙ্কার কথা উল্লেখ করলাম। মার্চে জাপান সফর নিয়ে যে তথ্য শুনেছিলাম প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, সংসদের সমান্তরাল যে পরিষদ এবং এর ক্ষমতা ও কার্যবিধি, এগুলো অনেক কথাই বলে।




