বুধবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদায়ী বছরে ‘মব সন্ত্রাস’ করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়। এর আগের বছরে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হন ১২৮ জন।
ময়মনসিংহের ভালুকায় গত ১৮ ডিসেম্বর গার্মেন্ট শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মৃতদেহে আগুন দেওয়া হয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে দিপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ভালুকার দিপু দাস ছাড়াও মব সন্ত্রাসে প্রাণ হারানো কয়েকটি ঘটনার কথা আসক তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে। ৯ আগস্ট ভ্যানচোর সন্দেহে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় পিটিয়ে রূপলাল দাস (৪০) ও প্রদীপ দাসকে (৩৫) হত্যা করা হয়। রূপলাল জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন আর প্রদীপ ভ্যান চালাতেন। ২ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চেঙ্গেরখাল সেতুতে চোর সন্দেহে কিশোর রেহান উদ্দিন ওরফে মাহিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ২০২৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল। সরকার মানবাধিকার সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ রাখবে বলে আশা করছি। তবে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তিনটি বিষয় অনুমোদনসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করেছে।
আসকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছর কারা হেফাজতে ১০৭ জন মারা গেছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। আসক বলছে, বছরজুড়ে কোনো প্রমাণ, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া না মেনে সন্দেহের বশে গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। ‘তৌহিদী জনতা’র নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে হেনস্তা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে মব করে হত্যা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে, যা আইনের শাসনের জন্য হুমকি।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং পুরোনো নিপীড়ন পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে চলছে। এটি সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের। এ ছাড়া প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টারে হামলা-আগুন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের বাধা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা উল্লেখ করে আসক বলেছে, এই সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে পড়েছে। এসব ঘটনা বাক্স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনির ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। এই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন দলমত-নিরপেক্ষ সাধারণ নাগরিক।
মব সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ভিন্নমত, উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ ঘটনা ঘটে। মব সন্ত্রাস করে দেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও শিল্প-সাহিত্য চর্চাকেন্দ্র ভাঙচুর, নারী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের হেনস্তা করা হয়েছে।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা মানবাধিকার উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সামনে আসে। এ বছর কারাগারে মারা যাওয়া ১০৭ জনের মধ্যে ৬৯ জন হাজতি ও ৩৮ জন কয়েদি ছিলেন। সর্বোচ্চ ৩৮ জন মারা গেছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সাবেক শিল্পমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, মৃত্যুর পরও হাতকড়া পরানো অবস্থায় তাঁকে বহন করা হয়েছে। এসব ছবি ও দৃশ্য জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। পরিবারের পক্ষ থেকে এই মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই ঘটনা বন্দিদের সঙ্গে আচরণ-সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, কারাবিধি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। আগের বছর কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছিল ৬৫ জনের।
কথিত বন্দুকযুদ্ধ থামেনি
আসক জানায়, ২০২৫ সালে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে বিচারবহির্ভূত হত্যা অব্যাহত ছিল। এ বছর কমপক্ষে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজতসহ কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৬ জন। এ ছাড়া ১২ জন বিভিন্ন থানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন। ২০২৪ সালে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছিল ২১ জন। এ ধরনের একাধিক ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বন্দুকযুদ্ধ-সংক্রান্ত ঘটনাগুলোতে তথ্যের স্বচ্ছতা নেই। স্বাধীন তদন্তের অভাব রয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্যই চূড়ান্ত। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতা
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় চার হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন নিহত, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। বিএনপির কোন্দলে অন্তত ৩৯ জন নিহত হন।
আসক বলছে, এসব ঘটনা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট ও সহিংসতার সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এ ছাড়া সারাদেশে দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ১১১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকির শিকার হয়েছেন ২৩ সাংবাদিক। প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন ২০ জন। প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতকে কেন্দ্র করে মামলার সম্মুখীন হয়েছেন কমপক্ষে ১২৩ জন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি হামলার শিকার হন ১১৮ জন।
এমএসএফ’র প্রতিবেদন
২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারসহ সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বছরজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং গণপিটুনির ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা, গণগ্রেপ্তার এবং গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনা জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে।
গতকাল বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে কিছু সুপারিশ তুলে ধরে এমএসএফ। এর মধ্যে রয়েছে– বিচারবহির্ভূত ও হেফাজতে মৃত্যু বন্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন, হয়রানিমূলক মামলা রোধ, সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং মব সন্ত্রাস রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।




