মব আক্রমণ: ফিকে হচ্ছে আশা, ফিরে আসছে সহিংসতা

গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ডেইলি স্টার-এর ৩৫ বছর বয়সী প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম ও তার ২৮ জন সহকর্মী দ্রুত ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। তাদের আশা ছিল, সেখানে অপেক্ষা করলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হবে।

তবে জাইমা ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেতরে আটকে পড়া সবাই বুঝতে পেরেছিলেন যে, উত্তেজিত জনতা শুধু কার্যালয় ভাঙচুর করেই থামবে না, আগুনও ধরাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই জানতাম। এই মব শুধু অফিস ভাঙচুরে থামবে না, তারা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেবে।’

এক পর্যায়ে ঘন ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, ধোঁয়ায় মোবাইল ফোনও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। সেই অবস্থায় জাইমা ইসলাম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন, যা তিনি নিজের শেষ বার্তা বলে মনে করেছিলেন।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। চারদিকে এত ধোঁয়া। আমি ভেতরে আটকে আছি। তোমরা আমাকে মেরে ফেলছ।’

এই ঘটনা রাজধানীতে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাংবাদিক সমাজ বলছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

সাম্প্রতিক এই সহিংসতা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অস্থির ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সরকার যে চাপের মুখে রয়েছে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। বিশেষ করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাব্য নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা আরো বাড়তে পারে—তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলার ঘটনা কোনো আকস্মিক বিষয় ছিল না। এর আগেই প্রথম আলোর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক জাইমা ইসলাম শুক্রবারের সংস্করণের জন্য প্রতিবেদন জমা দিতে গিয়ে বাইরে উত্তেজিত জনতার শব্দ শুনতে পান। তিনি পরিস্থিতি দেখে দ্রুত বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন। তবে দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি দেখতে পান, হামলাকারীরা ইতিমধ্যেই সেখানে উপস্থিত। এর কিছুক্ষণ আগেই বিক্ষুব্ধ জনতা দেশের আরেক পত্রিকা প্রথম আলোর কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

দুই পত্রিকার সাংবাদিকরাই সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় সরকারের বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীলদের আগেই সতর্ক করেছিলেন। হামলার সময় অগ্নিনির্বাপক বাহিনী মইয়ের মাধ্যমে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের নামিয়ে আনার চেষ্টা করলে উত্তেজিত জনতা তাদের ওপরও হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। শেষ পর্যন্ত ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া সাংবাদিক ও কর্মীদের নিরাপদে বের করে নিয়ে যায়।

গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয় শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের একজন পরিচিত নেতা। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, হাদির হত্যাকারীরা শেখ হাসিনার অনুগত এবং তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুত জড়ো হওয়া জনতা আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলায় নেমে পড়ে। এই সহিংসতায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, উভয় পত্রিকার কার্যালয়ই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

ঘটনাটি সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের মাত্র ১৫ মাস পরেই এমন সহিংসতা দেশের ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে এক পোস্টে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ‘সঠিক মানুষদের’ কাছে অসংখ্য ফোন করেছিলেন, কিন্তু তাতে কোনো ফল আসেনি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘আমি যদি পারতাম, তাহলে লজ্জায় মাটি খুঁড়ে নিজেকে চাপা দিতাম।’

এই ঘটনার পর সাংবাদিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

এদিকে প্রথম আলোর একজন সাংবাদিক, ভবনের ১৩তলা থেকে নিচে জমতে থাকা জনতার ভিড় দেখে তিনি উপলব্ধি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে যে আশার জন্ম হয়েছিল, দেশ তা থেকে কতটা দূরে সরে গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধীদের কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল এবং গণমাধ্যম কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।

তবে গত বছর তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তরুণ আন্দোলন নেতারা ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, নতুন বাংলাদেশ পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতা ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে।

ওই সাংবাদিক বলেন, ‘আমি এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম, কারণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনে আমরা টানা ১৫ বছর যেন অন্ধকার কারাগারে বন্দি ছিলাম। কিন্তু গত ১৬ মাসের মধ্যে এই প্রথম আমার মনে হয়েছে, আমরা কি এখন একেবারে তলানিতে নেমে গেলাম?’

তিনি জানান, আগের সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা নিয়ে প্রতিবেদন করতে তিনি নিজেকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন মনে করেছেন। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ওই সাংবাদিক আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময়টা খুবই খারাপ ছিল। প্রথম আলো হুমকির মুখে পড়েছিল, হামলার শিকারও হয়েছিল। কিন্তু এবার যেভাবে হামলা হয়েছে এবং সরকার থেকে একেবারেই কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি, তা ভীষণই হতাশাজনক। সরকার যেন জনতার চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।’

ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদক জিয়া চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সব সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের কর্মীরাই নিজেদের অনিরাপদ মনে করছেন। সতিনি বলেন, ‘মাঠে কাজ করার সময় বা কোনো কঠিন ও সমালোচনামূলক প্রশ্ন করলে ক্ষুব্ধ কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা তাড়া খাওয়ার ভয় সব সময় কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেই আশাটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।’

এদিকে জাইমা ইসলাম বলেন, ঘটনার সময় নিরাপত্তা বাহিনী লোকজনের ওপর গুলি চালাক, তা তিনি চাননি। কিন্তু সাংবাদিকদের রক্ষা করার জন্য আরো অনেক কিছু করা উচিত ছিল। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে বাংলাদেশ যেন প্রতিশোধের এক অবিরাম চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ওই আন্দোলনে শেখ হাসিনার বাহিনীর হাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এর পরপরই পুলিশ এবং যাদের শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত বলে মনে করা হয়েছিল, তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়।

তবে জাইমা ইসলাম মনে করেন, এই সহিংসতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ এখনো রয়েছে। তার মতে, গত সপ্তাহের হামলাগুলোকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে ধরে নিয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করা দরকার। এ জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে, যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তারা যেন প্রকৃত অপরাধী হন তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে প্রায়ই ব্যাপক পুলিশি অভিযান চালিয়ে অনেককে আটক করা হয়, শুধু দেখানোর জন্য যে ‘কিছু একটা করা হচ্ছে’। কিন্তু এমন নির্বিচার গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে আশা করছি, অন্তত এই বিষয়টি যেন না ঘটে। কারণ আমি প্রতিশোধের সংস্কৃতিকে দীর্ঘায়িত করতে চাই না। এখনও আমাদের সামান্য আশা আছে। এখনো পুরোপুরি আতঙ্কিত হওয়ার বা চরম দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার সময় আসেনি।’

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতায় অন্তত ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন। এর তুলনায় ২০২৩ সালে এ ধরনের সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৫১।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ানোর পর এক হিন্দু পোশাকশ্রমিককে জনতা টেনে বের করে পিটিয়ে হত্যা করে। ক্রমবর্ধমান মব সহিংসতা, সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার ও সমাজ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025