জুলাই-আগস্টে পুলিশ হত্যার তদন্ত হবে

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের স্থাপনাগুলোয় ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল এবং পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছিল, ৪৪ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা যদিও এত কম সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি মানতে নারাজ। তাদের মতে, নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এসব হত্যার তদন্তের দাবি জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। তবে নতুন সরকার আসার পর পুলিশ হত্যা এবং স্থাপনায় হামলার ঘটনাগুলোর তদন্তে গ্রিন সিগন্যাল মিলেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্র বলেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশের স্থাপনায় হামলা ও সদস্যদের হত্যা করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। দেড় বছরেও তদন্ত না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সরকারের শীর্ষ মহলের কেউ কেউ। এসব ঘটনার মাত্র পাঁচটিতে মামলা হয়েছে, আটক হয়নি কেউ। পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও সরকারের সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ।

তবে পুলিশের একাধিক ইউনিট হামলার আগে ও পরের ভিডিও ফুটেজ এবং আলামত সংগ্রহ করে রেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ‘সংকেত’ না দেওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তর তদন্তের কাজ এগোতে পারেনি। আন্দোলনের সময় কারাগারে হামলা চালিয়ে বন্দি ছিনতাই এবং কারাগারে আগুন ধরিয়ে দেয়াল ও গেট ভেঙে বন্দিরা পালিয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার হয়নি অনেকে।

এখন পুলিশের স্থাপনায় হামলা-আগুন ও সদস্যদের হত্যার ঘটনা তদন্ত করে মামলা করতে পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ বার্তা এসেছে বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনার গভীরে গিয়ে এখন তদন্ত করা হবে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলামত থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকার সহযোগিতা না করায় তদন্ত ও মামলার বিষয়গুলো থমকে ছিল।’ তিনি বলেন, ‘মামলা হলে অনেক রাঘববোয়াল ফেঁসে যেতে পারেন। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তদন্ত অবশ্যই হবে।’

তিনি জানান, কারাগার থেকে যেসব বন্দি পালিয়ে গেছে, তাদের ধরতে বিশেষ অভিযানও হতে পারে। তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ছাত্র-জনতা হত্যাকান্ডে হওয়া মামলাগুলোরও দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। যারা এসবে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ ছাড় পাবে না।

পুলিশে ক্ষোভ

সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে ও পরে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র লুট করার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের হত্যা করেছে। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। লুটের ঘটনায় পাঁচটি হামলা হলেও বেশিরভাগ ঘটনায় কিছুই হয়নি। কবে মামলা রুজু হবে নিশ্চিত করে বলতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ নিয়ে পুলিশে ক্ষোভ দেখা দিলেও প্রকাশ্যে কথা বলছেন না কেউ। তবে নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। সরকার থেকে বিশেষ বার্তা গেছে পুলিশ সদর দপ্তরে। বার্তায় বলা হয়েছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশের থানাসহ অন্যান্য স্থাপনায় হামলা ও নিহতের ঘটনার তদন্ত করতে হবে।

তদন্ত নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক

পুলিশ সূত্র জানায়, মামলার তদন্ত ও আসামিদের বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার বাইরে ও ভেতরে এবং আশপাশের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানায় তিনটি ও সিএমপির কোতোয়ালি থানায় দুটি মামলা হলেও আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা অনেককে। মামলার বাদী পুলিশ নিজেই।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ হত্যা, থানায় অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনায় আরও মামলা হবে দ্রুত। ক্রিমিনাল ইভেন্ট কখনো তামাদি হয় না। পুলিশ হত্যা ও থানায় লুটপাটের ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ শুরু করেছে।’

ছায়াতদন্ত হচ্ছে

থানায়, ট্রাফিক অফিস ও বক্সে হামলা চালিয়ে এসি, কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল লুট করা হয়। বেশিরভাগ স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নষ্ট করা হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামত। লুট করা হয় পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র। দুর্বৃত্তদের হামলায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ সদস্য মারা যান। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার মধ্যে ২১টি থানাসহ ২১৬টি স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে পুড়ে যায় ১৩টি থানা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের টহল গাড়িও। এসব ঘটনায় মামলা হয়নি, তদন্তও শুরু হয়নি।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব ঘটনার তদন্ত শুরু না হলেও ছায়াতদন্ত হচ্ছে। স্থাপনা ও আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকদের হত্যা করার বিষয়ে মামলা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ মামলায় নিরীহ লোকজনকে আসামি করা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। নতুন সরকারের কাছ থেকেও বিশেষ নির্দেশনা পেয়েছি।’

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করার দাবি

ডিএমপির কয়েকটি থানার সাবেক ওসি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় আমরা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা বলেছি, সাধারণ শিক্ষার্থী ও লোকজন আন্দোলন করছে। তাদের ওপর গুলি চালানো ঠিক হবে না। এসব বলার পরও আমাদের অনুরোধ ঊর্ধ্বতনরা রাখেননি। আমরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে উত্তেজিত হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল মারতে থাকে। বাইরে থেকে গুলিও আসতে থাকে। একপর্যায়ে থানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি করতে থাকে। তাতেও টিকতে না পেরে তারা পোশাক খুলে পালিয়ে যান। যারা পালাতে পারেননি, তারা হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। আমরা চাচ্ছি এসব ঘটনায় থানায় মামলা হোক। তদন্ত হোক। সিসি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হোক। শিক্ষার্থী, নিরীহ লোকজনসহ যাদের হত্যা করা হয়েছে, তার জন্য দায়ীদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ভালো থাকুক, তা আমরা চাই।’

পুলিশের মামলার তদন্তে বিব্রত পুলিশ

আন্দোলন দমাতে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হামলা ও গুলি চালিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ঢাকাসহ সারা দেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের বিরুদ্ধে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলা রয়েছে ৬১২টির মতো। একেকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গড়ে একশোর বেশি মামলা হয়েছে থানা ও আদালতে। ১ হাজার ১৬৮ পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে আলোচিত ৬৮টি মামলা। পিবিআইয়ের তদন্তাধীন মামলায় ৯৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা আসামি রয়েছেন। সিআইডিসহ অন্য ইউনিটগুলো অন্য মামলার তদন্ত করছে। আসামির তালিকায় সাবেক আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পদমর্যাদার পুলিশ রয়েছেন। তদন্ত করতে গিয়ে বিব্রত তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এজাহারের সঙ্গে অনেক কিছুর মিল পাচ্ছেন না তারা।

নতুন করে কললিস্ট সংগ্রহ হচ্ছে

সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কললিস্ট সংগ্রহ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য সেখানে উপস্থিতি ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া, দায়িত্ব পালনের সিসি সংগ্রহ করা (কমান্ড সার্টিফিকেট) হচ্ছে ওইদিন তার কোন এলাকায় দায়িত্ব ছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। কোনো কারণে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তার মোবাইল ফোন বাসায় রেখে বা তার সিসি গোপন করে অন্য এলাকায় গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই ওইসব এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত ওইদিনের ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে। কয়েকটি টেলিভিশনে ফুটেজ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

মামলার পরিসংখ্যান

থানা ও আদালতে যেসব মামলা হয়েছে, তাতে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা এবং আমলাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকায় সর্বাধিক ৩৩৩টি মামলা হয়েছে। তা ছাড়া ঢাকা রেঞ্জে ১৪৮টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ২০টি, রাজশাহী রেঞ্জে ২২টি, সিলেট রেঞ্জে ১৫টি, জিএমপিতে ১৬টি, সিএমপিতে ১০টি, এসএমপিতে ৩টি, খুলনা রেঞ্জে ১০টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, আরএমপিতে ৫টি এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৭টি মামলা রুজু হয়েছে।

সূত্র: দেশ রূপান্তর

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025