দ্রুত বদলে যাচ্ছে জিওপলিটিক্যাল স্ট্র্যাটিজি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে-পরে বিএনপি-জামায়াত উভয়েই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল। তখনও দুদলের কেউই নিশ্চিত ছিল না। ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরলে বিশাল জনসমাবেশ করে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। এর পর পরই বেগম খালেদা মারা গেলে তার জানাজায় আরও বিশাল জনসমাবেশ ঘটানো হয়। দুক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তারেককে লাল গালিচা সম্বর্ধনাসহ নিরাপত্তা দেয়। বলা যেতে পারে বিএনপি’র শুকনো খালে জলপ্রপাত ঘটে যায়।
সেটা দেখেই প্রমাদ গোণে জামায়াত। তারা বেশ কয়েকবার অভিযোগ করে, একটি দলকে জয়ী করার জন্য সরকারের লোকজন কাজ করছে। এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছেও নালিশ জানায় জামায়াত। সেসময় মনে করা হচ্ছিল বিএনপির জয় নিশ্চিত। কেবল মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা।
এর পর পরই রুলেতের আইভরি বলটি দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাঁচ সদস্যের একটি দল এমাসের গোড়ার দিকে ঢাকায় এসে তৎপরতা শুরু করে। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন দায়িত্ব নিয়েই ‘সকল’ দলের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফেলেন। এরই মধ্যে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক অতিরিক্ত তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার সঙ্গে বৈঠক সেরেই উড়ে যান দিল্লি। সেখানে ভারতীয় কয়েকজন সেক্রেটারির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কেউ রাজি হয়নি। এরপর তিনি একজন প্রাক্তন সেক্রেটারি, দুজন প্রাক্তন কর্মকর্তা ও একজন সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠক করে বুঝতে চেষ্টা করেন; বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি কি? সারাহ কুক দিল্লিতে বলেন-‘বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো’। তার এই মেকিং স্টেটমেন্ট শুনে স্তম্ভিত হন ভারতীয় কূটনীতিকরা।
তিনি দিল্লিতে থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ২১ তারখে হঠাৎ করে একই দিনে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘আল-জাজিরা’ ও ‘রয়টার্স’-এর মত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মিডিয়ায় তিনটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। যার বিষয়বস্তু প্রায় একইরকম- জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব করতে চায়’ যুক্তরাষ্ট্র।
ওয়াশিংটন পোস্ট লেখে― “জামায়াতে ইসলামী আগামী মাসের জাতীয় নির্বাচনে তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে—এমন মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এক কূটনীতিক কয়েকজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানিয়েছেন। তাদের ওই কথোপকথনের একটি অডিও পেয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো ফল করতে যাচ্ছে।“
গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘আরো বেশি ইসলামমুখী’ হয়ে উঠেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে।’ ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা (জামায়াত) আমাদের বন্ধু হোক।’ তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, ‘জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিজেদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে তারা আগ্রহী কিনা।’ ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন? তারা কি আপনাদের শো-তে আসবে?’
জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে তারা শরিয়াহ আইন চালু করবে এমন আশঙ্কাও নাকচ করে ওই কূটনীতিক বলেন, ”আমি একেবারেই বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়াহ চাপিয়ে দিতে পারবে। দলটির নেতৃত্ব যদি উদ্বেগজনক কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই শতভাগ শুল্ক আরোপ করতে পারে।“
মার্কিন কূটনীতিকের এমন ‘ওভারল্যাপ’ দেখে ওয়াশিংটন পোস্ট ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা মোনিকা শাই-এর সঙ্গে কথা বলে। তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের ওই বৈঠকটি ছিল একটি নিয়মিত, অব দ্য রেকর্ড আলোচনা, যেখানে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সাংবাদিকরা অংশ নেন। ওই আলোচনায় একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রসঙ্গ এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেয় না।’ অর্থাৎ তারা বলতে চাইছেন, শুধু জামায়াত নয়, তারা সকল দলকে সমানভাবে দেখেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এ কূটনৈতিক তৎপরতা ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংকট্যাংক উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই তলানিতে ঠেকেছে। ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাত, রাশিয়ার তেল কেনা, অসমাপ্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপ—এসব ইস্যুতে দ্বন্দ্ব বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বহু বছর ধরেই।’ তার মতে, ভারত এ দলটিকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।“

স্মরণ রাখা দরকার ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চারটি বৈঠক করেছে। ঢাকায়ও একাধিক বৈঠক হয়েছে। গত শুক্রবার দলটির শীর্ষ নেতা ভার্চুয়ালি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
ওয়াশিংটনে হওয়া বৈঠকগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে তারা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হওয়া বৈঠকগুলোকে ‘নিয়মিত কূটনৈতিক কাজ’-এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করে বোঝাতে চেয়েছেন-এসব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।
হাতে আসা অডিওর বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ঢাকায় দূতাবাসের ওই বৈঠকে মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি মিশনের কর্মীরা হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক, কারণ আমরা চাই প্রয়োজনে ফোন তুলে বলতে পারি—আপনি যে কথাটা বললেন, সেটার পরিণতি এভাবে ঘটবে।’
তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী যদি ক্ষমতায় এসে ওয়াশিংটনের কাছে অগ্রহণযোগ্য নীতি বাস্তবায়ন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিশাল পোশাক শিল্পে মদদ দেবে না।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি, রফতানির ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ যদি নারীদের কাজ থেকে সরিয়ে দেয় এবং শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেয়, তাহলে আর কোনো অর্ডার আসবে না।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘জামায়াত এটা করবে না। এত বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ আছে যে তারা এমনটা করবে না। আমরা তাদের খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দেব—কী ঘটতে পারে।’
ভাবনার বিষয়- মার্কিন কূটনীতিক কত পরম নির্ভরতার সঙ্গে বলছেন-‘তাদের মধ্যে এত বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষ আছে যে তারা শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবে না!’ ২০২১ সালে আফগানিস্তান ছাড়ার সময়ও মার্কিনীরা বলেছিল-‘তালিবানরা কথা দিয়েছে, তারা এবার আর নারীদের অন্তঃপুরে রাখবে না এবং জোর করে শরিয়াহ শাসন চাপিয়ে দেবে না।‘
মার্কিনীরা জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে এতটাই বেপরোয়া যে এতে নয়াদিল্লির উদ্বেগকেও পাত্তা দিতে রাজি নয়। তাদের মতে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ক যদি ভালো অবস্থায় থাকত, তাহলে নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে ভারতের উদ্বেগকে বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু যেহেতু সম্পর্ক এখন চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে, তাই আমরা মনে করি না যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ভারতীয় উদ্বেগের প্রতি অতটা মনোযোগী থাকবে।
আল-জাজিরা এ বিষয়ে একেবারে কাছা খুলেই নেমেছে। তাদের শুরুটা এমন- ‘জামায়াতে ইসলামী দলের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের জন্য প্রচারণা চালাতে গিয়ে যাদের সাথেই দেখা হয়েছে তারা জামায়াতের পক্ষে ‘একতাবদ্ধ ভোট’ দিচ্ছেন, কারণ বিশ্বের অষ্টম-বৃহৎ জনবহুল দেশটিতে ইসলামপন্থী দলটিকে সাধারণত বলা হয়, গ্রহের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার আবাসস্থল!’
আল-জাজিরার রিপোর্টার মাসুম বিল্লাহ। জামায়াতকে হাইলাইটেড করতে গিয়ে রিপোর্টটিকে আবেগ জ্যাবজেবে করে ফেলেছেন। এক জায়গায় লিখেছেন-“যদি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়, তাহলে হাসিনার ১৫ বছরের সরকারের সময় যে দলটি নির্মম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল, তার জন্য এটি একটি নাটকীয় পরিবর্তন হবে। হাসিনার অধীনে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, এর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল বা জেলে পাঠানো হয়েছিল এবং এর হাজার হাজার সদস্যকে জোরপূর্বক গুম করা হয়েছিল বা হেফাজতে হত্যা করা হয়েছিল।“
এরপর আরও এক পোচ কালি দিয়ে একাত্তরের ইতিহাস বিকৃত করে বলেছেন-“১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে সন্দেহভাজনদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল – একটি বিতর্কিত আদালত যা হাসিনা ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।“
তুলনায় রয়টার্স লিখেছে, “স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নিন্দিত এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ থাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দলটি আগামী মাসে সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন করে গড়ে উঠছে এবং নতুন সমর্থন আকর্ষণ করছে, যা মধ্যপন্থী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অস্থির করে তুলছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার পরপরই জামায়াতে ইসলামী তাদের সংস্কার শুরু করে। হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর, জামায়াত তার দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তি, কল্যাণমূলক প্রচারণা এবং বিশ্লেষকরা দলের সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্স প্রদানের জন্য জনমতের উপর নির্ভর করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের একটি মতামত জরিপে জামায়াতকে সবচেয়ে ‘পছন্দসই’ দল হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে।
হাসিনার বিদায়ের পর থেকে, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলি ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হিন্দু এবং সুফি মাজারগুলিতে আক্রমণ করা হয়েছে, অন্যদিকে বাউল ও লোকসঙ্গীতশিল্পীদের গান গাওয়া থেকে শুরু করে মহিলাদের ফুটবল ম্যাচ পর্যন্ত অ-ইসলামিক বলে আক্রমণ করেছে এবং বাতিল করেছে।“
এখন প্রশ্ন হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন একটি ধর্মভিত্তিক উগ্র সাম্প্রদায়িক দল যাদের ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র শিবির’কে কিছুদিন আগেও বিশ্বের তিনটি সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রেখেছিল-তারা কেন এখন জামায়াত ও শিবিরকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে শুধু নয়, নির্বাচনে যেন জামায়াত জয়ী হতে পারে তার সকল ‘ব্যবস্থা’ নিচ্ছে এবং অন্যদেরও সমর্থন করার জন্য চাপ দিচ্ছে?
একই প্রশ্নের দ্বিতীয় ভাগ, কেন মার্কিনীদের পাশাপাশি ব্রিটিশ সরকার, ইইউ একেবারে খোলামেলা জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চাইছে?
এতে করে ভারত এই বিষয়কে যে স্বাভাবিকভাবে নেবে না সেটা জেনেও কেন এরা অতিরিক্ত তৎপর? বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যাদের ক্ষমতায় রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘লেবার পার্টি’, একাত্তরে যাদের পূর্ণ সমর্থন ছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের প্রতি?
এর উত্তর অনেক বিস্তৃত। সংক্ষেপে বলা যায়-ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যানিটি, মুক্ত-স্বাধীন চিন্তার বিকাশ কথাগুলো পশ্চিমাদের স্রেফ বুলিবাগিশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন বাইডেন প্রশাসন থেকে একচুল সরেনি, তেমিন স্যার কিয়ার স্টারমার প্রশাসনও টোরি দলের নীতি-আদর্শ থেকে একচুল সরেনি।
ইঙ্গ-মার্কিন শক্তির প্রধান ফার্টাইল গ্রাউন্ড অবশ্যই মিয়ানমার। মিয়ানমারের বিপুল পরিমান রেয়ার আর্থ মিনারেলের প্রতি লোভ তাদেরকে ব্যাকুল করে তুলেছে। মিয়ানমারকে চীনের কব্জা থেকে সরাতে বাংলাদেশে তাদের এমন একটা সরকার দরকার যারা ভারতবিরোধী এবং মিয়ানমারবিরোধী। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ‘আরসা’কে যারা সবরকম সহায়তা দেবে।
পাশাপাশি বাংলাদেশের উপর পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি করে ‘ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ গড়ে তোলা হবে যারা ভারতের ওপর ক্রমাগত চাপ দেবে। ফলে ভারত এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না, বরং নিজেদের ‘সেভেন সিস্টার্স’ আর ‘চিকেন নেকস’-এর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাতীব্যস্ত থাকতে বাধ্য হবে।
একই ধরণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাকি তিনটি দেশ-চীন-পাকিস্তান-তুরস্কও ভারতকে এই অঞ্চলের প্রভুত্ব করতে না দেওয়ার স্ট্র্যাটিজিতে জামায়াতকে সমর্থন দিচ্ছে। তাদের কৌশল হলো ভারত যেহেতু বিএনপিকে ‘মোটামুটি মেনে নিচ্ছে’ (বেগম খালেদার জানাজায় জয়শঙ্করের আগমন ও মোদীর বিশেষ শোকবার্তা হস্তান্তর) সেহেতু বিএনপিকে দিয়ে তীব্র ভারত বিরোধীতা করানো যাবে না।
এই স্ট্র্যাটিজিক্যাল ম্যালফাংশনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপির চেয়ে জামায়াতই যোগ্যতম।
তাহলে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, চীন, পাকিস্তান ও তুরস্ক’র ‘রেসের ঘোড়া’ হিসাবে জামায়াতই ১২ তারিখের নির্বাচনে ক্ষমতায় বসছে?
এখনই এমন সীল মেরে দেওয়া যাবে না। ‘পিকচার আভি বাকি হ্যায়’। কি সেই ‘পিকচার’? সেটার উত্তর খোঁজার আগেই বিবেচনায় রাখতে হবে-একটা দেশ কখন তার হাই কমিশনের স্ট্যাটাস-‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ করে? এর আগে ভারত এটা করেছিল মাত্র তিনটি দেশের সঙ্গে-পাকিস্তান-ইরাক ও আফগানিস্তান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ, চীন, পাকিস্তানের সমর্থনের খবর ভারত যেমন জানে, তেমনি জানে নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত ব্যাপক কারচুপি করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অসংখ্য চোরাই ব্যালট পেপার ছাপা হয়ে হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। বিএনপি হার্ট এন্ড সোল চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে নাকের ডগায় জাজ্বল্যমান জঙ্গি হুমকি, ভারত ভাগের হুমকি এবং একটা পার্মানেন্ট ইস্টার্ন ফ্রন্ট খুলে যাওয়ার বিপদ বসে বসে দেখবে? না ‘ব্যবস্থা’ নেবে? সেই ‘ব্যবস্থা’রই পূর্ব সতর্কতাতেই কি দূতাবাসের সকল পরিবার-পরিজন-আত্মিয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে?
এই সামগ্রিক বিষয়টা বিএনপি কীভাবে নিচ্ছে সেটাও জরুরি। যে যুক্তরাজ্যের সহায়তায় তারেক দেশে ফিরেছেন, সেই যুক্তরাজ্য এখন প্রকাশ্যে জামায়াতকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে। একটা গণতান্ত্রিক দল হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউ ও চীনের সঙ্গে বাইল্যাটারাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাওয়া বিএনপিকে তারা ‘ভরসা’ করছে না। এটা জেনে বিএনপি কাউন্টার স্টেপ নিতে সম্ভবত দেরি করে ফেলেছে। তারেক-খালেদা, খালেদা-তারেক বিষয় দুটিই বিএনপির রাজনীতির ‘স্টার্টার’। সেসব করতে গিয়ে তারা খেয়াল করেনি জামায়াত কীভাবে আন্তর্জাতিক ঘোড়েলগুলোকে খাঁচায় পুরেছে।
বিএনপি এখন কি করবে? ‘Better late than never’?




