অগ্নিগর্ভ ইরান, শেষ পরিণতি কি?

ইরানে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা গণবিক্ষোভ নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ মোটা দাগে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। যার ফলে ইরান বিষয়ক খবর এবং বিবিধ এক পাক্ষিক মতামত আসায় প্রকৃত খবর পাওয়া যাচ্ছে না। যারা ২০২৪-এ বাংলাদেশে ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্রকে ‘বিপ্লবটিপ্লব’ বলে আসছেন তারাই আবার ইরানের জনবিক্ষোভকে সমর্থন করতে পারছেন না, কারণ ইরানে আমেরিকা-ইসরায়েলের যোগসাজসকে বৈধ্যতা দিলে তারাও ওই পাপে পাপী প্রমাণিত হবেন। আবার মৌলবাদীদের ‘বস’ আমেরিকা তাদের প্রিয়ভাজন ইসলামি হুকুমতকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে বলে গণবিক্ষোভ সমর্থন করছেন না, অথচ আমেরিকাকে সরাসরি সমালোচনাও করতে পারছেন না। এদিকে বিগত সরকারের সমর্থকরা ডিপস্টেটের ষড়যন্ত্রকে শেখ হাসিনা কঠোরভাবে দমন করতে না পারলেও খামেনি পারছেন বলে খামেনিদের ৪৬ বছরের বর্বর স্বৈরশাসন সমর্থন করে বসছেন।

কেউ কেউ আশাবাদী হয়ে বলছেন―মার্কিন-জায়ানিস্ট ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে। কেউ কেউ খামেনির স্পেশাল বাহিনীর নির্মমতাকেও ‘পার্ফেক্টলি প্রসিকিউর’ বলে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। প্রকৃতপক্ষে ইরানে কি ঘটছে সেটা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার মিডিয়ার কারণে জানাও যাচ্ছে না। এই অবস্থায় ‘নিরপেক্ষ’ সংবাদ বা ‘নির্মোহ’ বিশ্লেষণ দূরূহ ব্যাপার।

ইরানে কি ঘটছে?

ইরানে ইসলামি স্বৈরশাসনবিরোধী বিক্ষোভ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যম থেকে যতটুকু জানা যাচ্ছে তা হলো;

ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ধ্বসে পড়া অর্থনীতির কারণে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ধর্মতন্ত্র উচ্ছেদে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ইন্টারনেট এবং টেলিফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়ে, হাজার মানুষ হত্যা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা যাচ্ছে না।

সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ এবং আমেরিকার ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করার পর দেশটির উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা স্যাঙ্কশন আরও বেড়েছে। তাতে অর্থনৈতিক চাপ তীব্রতর হয়েছে, যার ফলে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের পতন হয়েছে। বর্তমানে ১.৪ মিলিয়নেরও বেশি দিয়ে ১ ডলার কিনতে হচ্ছে। এই মারাত্মক অর্থনৈতিক দুরাবস্থায় সাধারণ মানুষের পেটে খাবার নেই, স্কুলের ফি দিতে পারছে না, বিদ্যুৎ বিলসহ জীবিকা নির্বাহে দেউলিয়াদশা। বার্ষিক প্রায় ৪০ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির ঘটনায় মানুষ বাঁচার জন্য মরতে হলেও পিছুপা হচ্ছে না।

এই দুরাবস্থার কোনও চাপ কিন্তু শাসক শ্রেণীর ওপর পড়ছে না। তাদের আরাম-আয়েশ, বিলাস-ব্যাসন, অস্ত্র তৈরি, কেনা-বেঁচা, হুতি-হামাস-হিজবুল্লাহকে সামরিক, অর্থনৈতিক, লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া বন্ধ হচ্ছে না। তা স্বত্বেও ২০২৩ সালে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে ইরানের স্বঘোষিত “অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স” বা তেহরানের সমর্থিত দেশ এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর জোট ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভেনিজুয়েলায় সভ্যতাবিরোধী মাস্তানি করে সফল হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বুকের ছাতি ডবল হয়ে গেছে। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন―’তেহরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তাহলে আমেরিকা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে’।

আমেরিকা-ভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে ইরানের ৩১টি প্রদেশে ৫০০ টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে দুই হাজার। সাধারণ মানুষের তথ্য মতে এই সংখ্যা ধারণারও বাইরে! নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি! ১৫ হাজার জনেরও বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে কি করা হয়েছে জানা যায়নি। খবরে প্রকাশ; মরচ্যুয়ারিতে লাশগুলো পাশাপাশি রাখার জায়গা না থাকায় একটার উপর আরেকটা রাখা হচ্ছে।

যদিও ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বিক্ষোভ সম্পর্কে খুব কম তথ্য দিচ্ছে। ইরানের সাধারণ সাংবাদিকরাও রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞায় পড়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দাঙ্গাবাজদের ‘দেশের দুশমন ও আল্লাহবিরোধী’ বলেও বিক্ষোভ থামাতে পারছেন না।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে তেহরানের ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়, তারপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো থাকলেও পরে বিক্ষোভকারীরা সরকার বিরোধী বক্তব্য দিতে থাকে এবং শেষে ৪৬ বছরের ইসলামি শাসন উচ্ছেদের ডাক দেয়। এর আগের বিক্ষোভের সঙ্গে এবারের পার্থক্য হলো, এবার এর পেছনে শাহ রেজা পাহলভীর পুত্র আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর ইন্ধন রয়েছে। ইরানের এই নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির সমর্থনে কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছেন এবং তিনিই চলমান বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন।

রেজা পাহলভী, আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এটি মাহেন্দ্রক্ষণ, কারণ সদ্য গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ যুদ্ধে ইসরায়েল হামাসকে পরাজিত করেছে। লেবাননের শিয়া জঙ্গি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এক ঝটিকা আক্রমণে সিরিয়ায় ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং ক্লায়েন্ট বাশার আল আসাদকে উৎখাত করেছে আমেরিকা। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের উপরও ইসরায়েলি-মার্কিন বাহিনীর হামলা হয়েছে।

ইসলামিক বিপ্লবের আগে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ মিত্র ছিল। আমেরিকান সামরিক অস্ত্র কিনেছিলেন এবং সিআইএ এজেন্টদের প্রতিবেশী সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর নজরদারি করার জন্য সবরকম সহায়তা করেছিলেন। তারই প্রতিদানে সিআইএ ১৯৫৩ সালে একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে শাহের শাসনকে শক্তিশালী করেছিল।

১৯৭৯ সালে শাহ’র শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তিনি ইরান থেকে পালিয়ে যান। এরপর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব আসে, যা ইরানে ধর্মতান্ত্রিক সরকার তৈরি করে। সেই বছরের শেষের দিকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে শাহের প্রত্যর্পণের দাবি করে এবং ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট সৃষ্টি করে, যার ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সেই থেকে ইরানের উপর মার্কিন স্যাঙ্কশন চলছে। কখনও খানিকটা স্থিমিত, কখনও তীব্রভাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে দুই সপ্তাহ পার হলেও বিক্ষোভকারীরা সফল হচ্ছে না কেন?

প্রথমত: বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে কিন্তু সেই খবর বাইরে আসছে না। বিক্ষোভকারীরা মসজিদে আগুন দেওয়ায় অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ বিক্ষোভ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। নিহতদের অধিকাংশই ২০ থেকে ২৫/২৬ বছরের তরুণ।

দ্বিতীয়ত: খামেনির স্বৈরশাসনে জর্জরিত ইরানবাসী এই শাসনের অবসান চায় অথচ ‘আমেরিকার দালাল’ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসন চায় না।

তৃতীয়ত: এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত মার্কিন অর্থ সাহায্য আসেনি, যেমনটা বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই এসেছিল। তাহলে কি বিক্ষোভ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হতে চলেছে? না, সেটি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

ইরানের মিত্ররা কি করছে?

আন্তর্জাতিকভাবে ইরান তার মিত্র রাশিয়া ও চীনের সহায়তা পাচ্ছে বটে, তবে তা অপ্রতুল। রাশিয়া ইউক্রেনে নতুন করে হামলা শুরু করায় এবং ভেনিজুয়েলাকাণ্ডে সহায়তা করার জন্য তাদের দুটি অয়েল ট্যাঙ্কার মার্কিনীরা জব্দ করায় কিছুটা ব্যাকফুটে। চীন তার জ্বালানি তেলে বৃহৎ অংশ পেত ভেনিজুয়েলা থেকে। সেখানে তাদের বিনিয়োগ ২শ’ বিলিয়নেরও বেশি, যা ভেস্তে যেতে বসেছে। চীনে তেল-গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাপ্লায়ার ছিল ইরান। এখন সেটাও বন্ধ। তাই চীন সরাসরি সামরিক সহয়তা দিতে পারছে না।

তার পরও খামনীর হুঙ্কার?

খামেনী তীব্র ভাষায় বিক্ষোভকারীদের হুমকি দিয়েছেন এবং নির্মমভাবে সেনাবাহিনী দিয়ে দমন করাচ্ছেন। এর ফলে ধরে নিতে হবে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের হুমকির পরও ইরান ভীত হচ্ছে না, কারণ চীন গোপনে সামরিক সহায়তা করেছে। গত বছর ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লাইন’ এবং আমেরিকার ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর পরে চীনা সামরিক পরিবহন বিমানের ঘন ঘন তেহরানে আসা-যাওয়া প্রমাণ করছে যে ইরান এখনও বৈশ্বিক আক্রমণ সামলাতে সক্ষম। সেই জোরেই বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমতা বাড়াতে পারছে।

তাতেই কি শেষরক্ষা হবে?

ট্রাম্প আবারও বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। ইরানও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে। প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে বলেছে- ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হবে। এদিকে ইসরায়েল মার্কিন হস্তক্ষেপের জন্য হাই অ্যালার্ট জারি করে রেখেছে। ভূমধ্য সাগরে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রয়োজনী সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন-‘আমরা খুব শক্তিশালী বিকল্প পখ খুঁজছি’। তিনি আরও বলেছেন, ‘তিনি ইরানের বিরোধী নেতাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। ইরানের নেতারা তাকে ফোন করেছিলেন এবং আলোচনা করতে চান এবং তিনি তাদের সাথে কথা বলতে পারেন।‘ এর জবাবে ইরানের এলিট বিপ্লবী গার্ডের প্রাক্তন কমান্ডার কালিবাফ বলেছেন-‘আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট। ইরানের উপর আক্রমণ হলে ইসরায়েল এবং সমস্ত মার্কিন ঘাঁটি এবং জাহাজ আমাদের আক্রমণের লক্ষ্য হবে।‘

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইরানি কর্তৃপক্ষের সহিংসতার খবরে হতবাক এবং সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নিহত শহীদদের সম্মানে’ রবিবার কর্তৃপক্ষ তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন- ‘ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্থিতিশীলতার মূল পরিকল্পনা করছে এবং ইরানের শত্রুরা সন্ত্রাসীদের যারা মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়, ব্যাংক এবং জনসাধারণের সম্পত্তি লুট করেছে। আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি: আপনাদের ছোট বাচ্চাদের দাঙ্গাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের সাথে যোগ দিতে দেবেন না।‘

প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক এবং ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার মনে করেন, বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটাতে পারবে না। তিনি মনে করেন এই বিক্ষোভ ইরান শেষ পর্যন্ত দমন করবে, তবে ইরানের এলিটরা এখনও সংঘবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে এবং তারা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গ দেবে না।

অথচ ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানী বিক্ষোভকারীদের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। ট্রাম্প বলেন-‘ইরান স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছে সম্ভবত আগের মতো ব্যর্থ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।’

এক ফোনালাপে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিক্ষোভকারী ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছিলেন। কেএনবিসি নিউজ এ খবর দিয়েছে। ইরান সেনাবাহিনীও কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে মিডিয়ায় দেখিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কি ঘটতে পারে?

এটা এক জটিল অংক। তার পরও অনুমান করা যেতে পারে মাত্র। সে অনুযায়ী―

এক. আমেরিকা এই মুহূর্তে অলআউট অ্যাটাকে যাবে না কারণ, তাতে করে দ্বিধাগ্রস্থ ইরানীরা বিক্ষোভ থামিয়ে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে চলে যাবে।

দুই. আমেরিকা ইরানে আক্রমণ করবেই, তবে সেটা নিজে নয়, ইসরায়েলকে দিয়ে। কেননা ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদ দখল করার পরও চীনকে কাবু করতে হলে চীনে ইরানী সাপ্লাই বন্ধ করতে হবে।

তিন. ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করার জন্য মুখিয়ে আছে কারণ, তারা জানে হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি জঙ্গি গোষ্ঠীকে টোটালি ডিসমেন্টাল করার জন্য তাদের হার্টলাইন ইরানকে ঠুকে দিতে হবে। এটা তাদের টেরিটোরি এক্সপ্যানশনের জন্যও জরুরি। ইসরায়েল তার নিকটবর্তী জর্ডান, মিশরকে বিপুল পরিমানে কারিগরি সহায়তা দিয়ে ‘বন্ধু’ বানিয়ে রেখেছে। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন আর স্কাড যুগে ফিরতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যে এখন তাদের একমাত্র এনিমি-ইরান।

চার. ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করার পর পরই আমেরিকা ইরানে আক্রমণ করবে। এক্ষেত্রে তারা সবাইকে চমকে দিয়ে পাকিস্তানকে মাঠে নামিয়ে দেবে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানে আমেরিকান সামরিক সরঞ্জাম পৌছুতে শুরু করেছে। এমনও হতে পারে আমেরিকার আগেই পাকিস্তান থেকে ইরানে মিসাইল উড়ে যাবে।

পাঁচ. হুমকি দেওয়ার পরও আমেরিকার ইরানে আক্রমণ না করার আরেকটি কারণ, তারা রাশিয়ার দুটি অয়েল ট্যাঙ্কার জব্দ করার পর রাশিয়া পাল্টা অ্যাকশন দেখিয়েছে পোল্যান্ড সীমান্তবর্তী ইউক্রেনের শহরগুলোতে হাইপারসনিক মিসাইল দেগে। এটা রাশিয়ার স্পষ্ট হুমকি-রাশিয়াকে ঘাটাতে আসলে ন্যাটো সদরদপ্তর উড়িয়ে দেওয়া হবে। কেননা ন্যাটো মারফৎ ইউক্রেনে যতো সামরিক সরঞ্জাম আসে তার সবই পোল্যান্ডে ডাম্প করা থাকে।

যদি শেষ পর্যন্ত আমেরিকা-ইসরায়েল ইরানে এয়ার অ্যাটাক করেও তথাপি খামেনীর পতন ঘটবে না যতক্ষণ না ল্যান্ড ফোর্স ইনভেড না করছে। আমেরিকা-ইসরায়েল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করে বসে নেই। অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে চলমান বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘মোসাদ’ রয়েছে। তারা দীর্ঘনি ধরেই ‘ফিল্ডওয়ার্ক’ করে চলেছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে থেকে সঠিক সময় সঠিক জায়গাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ইন্টেলিজেন্স ওয়ার্ক করে চলেছে।

স্মরণ রাখা দরকার ইসরায়েল যে ২০২৫ সালের জুনে ইরানে ১২ দিন ধরে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ পরিচালনা করেছিল সেই ‘রাইজিং লায়ন’ কি? সেটি ইরানের রেজা শাহ পাহলভীর আমলের পতাকার সিংহ! অর্থাৎ গত বছরই ইসরায়েল জানত মোহাম্মদ রেজা পাহলভীই হবে খামেনীর রিপ্লেসমেন্ট।

‘পেটে খেলে পিঠে সয়’! ইরানের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা এতটাই চরমে যে তারা এখন আর ধর্ম-ধার্মিকতা দেখছে না। তাদের এখন একটাই চাওয়া- মোল্লাতন্ত্র হঠাও। প্রয়োজনে রাজা আসুক, শাহ আসুক, অন্তত খেয়ে পরে তো বাঁচি। বিক্ষোভকারীরা দেশদ্রোহী, না খামেনীর রেজিম দেশদ্রোহী সেই বিচার এবং বাঁচার জন্য বিদেশিদের ডেকে আনা বিশ্বাসঘাতকতা নাকি না খেতে পেয়েও মোল্লাতন্ত্রকে মেনে নেওয়া কোনটা সঠিক?

হয়ত কোনও এক রাতে কিংবা সকালে ভয়ঙ্কর যুদ্ধবিমান ছেয়ে ফেলবে ইরানের আকাশ। হয়ত সাময়ীকভাবে হলেও মানুষ মুক্তি পাবে ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে। সেটা ভুল না সঠিক সে বিচার আমরা করতে পারি না কারণ, ভরপেট খেয়ে কোনোভাবেও অভুক্ত মানুষের কষ্ট অনুভব করা যায় না।

Tags :

Monjurul Haque

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025