ইরানজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানে সরকার

ইরানে চলছে ব্যাপক বিক্ষোভ। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ প্রতিহত করতে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার। আর তাতে বিশ্ব থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দেশটি। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশটির টেলিযোগাযোগও, বাতিল করা হয়েছে বহু ফ্লাইট। এর আগ পর্যন্ত ইরানের কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যম স্বল্প পরিসরে আপডেট তথ্য দিতে পারছিল।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাতেই ইরানজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিদেশ থেকে ইরানে ফোন করার চেষ্টা করেও সফল হননি রয়টার্সের সাংবাদিকরা।

দুবাই বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট জানায়, শুক্রবার দুবাই ও ইরানের বিভিন্ন শহরের মধ্যে নির্ধারিত অন্তত ছয়টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

এদিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, দাঙ্গাকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। খামেনি সতর্ক করে বলেন, বিদেশিদের ‘ভাড়াটে দালাল’ হিসেবে কাজ করা কাউকেই তেহরান সহ্য করবে না।

গত মাসের শেষ দিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি কেন্দ্র করে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দেশটির সব প্রদেশেই অস্থিরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এরই মধ্যে বহু মানুষের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে।

দেশটির বিভিন্ন শহরে আগুন জ্বলতে থাকার দৃশ্যও সামনে এসেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ছবিতে দাবি করা হয়, বাস, গাড়ি ও মোটরবাইক পোড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশন ও ব্যাংকেও আগুন দেওয়া হয়েছে। এসব সহিংসতার পেছনে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ভেঙে যাওয়া বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমকেও) জড়িত বলে অভিযোগ করেছে রাষ্ট্রীয় টিভি।

ক্যাস্পিয়ান সাগর উপকূলের বন্দর শহর রাশতের শরিয়াতি স্ট্রিটে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সাংবাদিক বলেন, এটা দেখতে পুরোপুরি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো লাগছে। সব দোকান ধ্বংস হয়ে গেছে।

ইরানের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) আরও জোরালো বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। প্রয়াত শাহের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্বের চোখ তোমাদের ওপর। রাস্তায় নেমে আসো।

গত সপ্তাহে তেহরানকে সতর্ক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। অবশ্য শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ট্রাম্প জানিয়েছেন, রেজা পাহলভির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি জানান, পাহলভিকে সমর্থন করা উপযুক্ত হবে কি না, সে বিষয়েও তিনি সন্দিহান।

ইরান এর আগেও আরও বড় আকারের বিক্ষোভ দমন করেছে। তবে বর্তমানে দেশটি আরও গভীর অর্থনৈতিক সংকট ও তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত সেপ্টেম্বর থেকে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা পুনরায় কার্যকর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার এক ফরাসি কূটনৈতিক সূত্র ইরানকে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।

২০২২ সালের শেষ দিকে নারী অধিকার ইস্যুতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল, এবারের আন্দোলন এখনো সেই মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে সেটির পর থেকে এটিই কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ একদিকে অর্থনৈতিক ইস্যুতে হওয়া বিক্ষোভকে ‘যৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করছে, অন্যদিকে তথাকথিত সহিংস দাঙ্গাকারীদের নিন্দা জানিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কঠোর দমন অভিযান চালাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে খামেনি বলেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন জোগাতে গত রাতে তেহরানে একদল ভাঙচুরকারী ও দাঙ্গাকারী রাষ্ট্রের, অর্থাৎ জনগণের একটি ভবন ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে তিনি ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, নিজের দেশ সামলান।

শুরুর দিকে বিক্ষোভ মূলত অর্থনীতিকেন্দ্রিক ছিল। গত বছর রিয়ালের বিপরীতে ডলারের মূল্য অর্ধেকে নেমে আসে এবং ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান যুক্ত হয়।

বিক্ষোভকারীদের স্লোগানের মধ্যে ছিল ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক’ ও ১৯৭৯ সালে উৎখাত হওয়া সাবেক রাজতন্ত্রের প্রশংসা। তবে ইরানের ভেতরে রাজতন্ত্র বা এমকেওর প্রতি প্রকৃত সমর্থনের মাত্রা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, তাদের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা গেছে অধিকাংশ বিক্ষোভকারী তরুণ পুরুষ। তবে ভিডিওগুলো যাচাই করতে পারেনি সংস্থাটি।

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025