গণভোটের প্রকৃত গণিত, ৬২% মানুষ সরাসরি “না” অথবা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

গণভোটের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সংখ্যার আড়ালে যে প্রকৃত সমীকরণ লুকিয়ে আছে তা নিয়ে এখন দেশজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সরকারি হিসেবে গণভোটের গাণিতিক ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, দেশের মোট ভোটারের বিশাল একটি অংশ—৬২.২৯% মানুষ আসলে এই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় একমত নন। গণিত কি মিথ্যা বলে? না, বলে না। চলুন তবে সংখ্যাতত্ত্বের আয়নায় দেখে নেওয়া যাক ‘জুলাই সনদ’ বা গণভোট নিয়ে দেশের মানুষের প্রকৃত রায় ঠিক কি ছিল।

ভোটের মাঠের সংখ্যাতত্ত্ব

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে, দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। তবে শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত থাকায় প্রকৃত ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৬ জন

ইসি সচিব আখতার আহমেদের তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০.২৬%। মজার ব্যাপার হলো, একই দিনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪%। একই সময়ে, একই পদ্ধতিতে দুই নির্বাচনে ভোটের হারের এই সামান্য পার্থক্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকলেও, আমরা সচিবের দেওয়া তথ্যকেই বিশ্লেষণের ভিত্তি ধরছি।

‘হ্যাঁ’ বনাম ‘না’-এর প্রকৃত চিত্র

ইসি সচিবের তথ্য অনুযায়ী, ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ‘হ্যাঁ’ এবং ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ ‘না’ ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এই হিসাবটি শুধুমাত্র প্রদত্ত ভোটের ওপর ভিত্তি করে। যদি আমরা মোট ১২ কোটি ৭৩ লাখ ভোটারের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টি দেখি, তবে চিত্রটি দাঁড়ায় নিম্নরূপ:

ভোটের ধরণভোটার সংখ্যা (প্রায়)শতাংশ (%)
“হ্যাঁ” ভোট (সরাসরি সমর্থন)৪ কোটি ৮০ লাখ৩৭.৭১%
“না” ভোট (সরাসরি প্রত্যাখ্যান)২ কোটি ২৫ লাখ১৭.৬৮%
ভোট দেননি (অনাগ্রহ/অংশগ্রহণহীনতা)৫ কোটি ৬৭ লাখ৪৪.৬১%

হিসাব করলে দেখা যায়, সরাসরি ‘না’ দেওয়া ১৭.৬৮% এবং ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া ৪৪.৬১% ভোটারকে যোগ করলে মোট সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৬২.২৯%। অর্থাৎ, দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ হয় সরাসরি এই প্রক্রিয়ার বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন, অথবা ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে এই প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ‘নো বোট, নো ভোট’ ক্যাম্পেইন এবং বিএনপির ভোটারদের একটি বড় অংশের নীরব অবস্থান এই পরিসংখ্যানে বড় প্রভাব ফেলেছে।

“সংবিধানকে সংশোধন করতে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সংবিধান যেহেতু শাস্তির বিধান রেখেছে, সেহেতু সংবিধান প্রতিপালন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অবশ্য-কর্তব্য।”

সার্বভৌম সংসদ ও আগামীর পথ

বিএনপি জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে আগেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি জানিয়েছিল। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এই গণভোটের ফলাফল আইনিভাবে কতটা টিকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেহেতু এই গণভোট হয়েছে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে, সেহেতু সার্বভৌম সংসদের ক্ষমতা রয়েছে এই অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইন হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, তারা কেবল সেই বিষয়গুলোই বাস্তবায়ন করবেন যেগুলোতে তাদের সম্মতি ছিল। ফলে একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সংস্কার বা গণভোটের রায় দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

সংবিধানকে সংশোধন করতে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সংবিধান যেহেতু শাস্তির বিধান রেখেছে, সেহেতু সংবিধানকে প্রতিপালন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অবশ্য-কর্তব্য।

[হ্যাঁ/না ভোটের শতাংশের হিসাব যদি পালটায়, তবে সংখ্যারও বদল হবে]

Tags :

Kabir Aahmed

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025