শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে দীপুকে ১১টি অত্যাধুনিক বিদেশি অস্ত্র ও ৩৯৪টি গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছেন যৌথ বাহিনী সদস্যরা।
শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার নিজ বাড়ি থেকে আটকের পর বাড্ডা থানার এসআই মো. হাসানুর রহমান বাদী হয়ে দীপুর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় শনিবার বিকেলে আদালতে হাজির করে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে।
দীপুর বরাত দিয়ে ডিবি’র একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে আসেন নব্বই দশকের ঢাকার অপরাধজগতের আলোচিত নাম শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন। অন্য দেশ থেকে তিনি বেশ কিছু অস্ত্র সংগ্রহ করেন। পরে বাড্ডা, মগবাজারসহ আশপাশের এলাকায় আবারো আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। মেরুল বাড্ডার আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা একটি মাছের আড়ত থেকেই দিনে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন সুব্রত বাইন ও তার সহযোগী মেহেদী হাসান, ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবু, সোহেল ওরফে কান্নি সোহেলরা।
সুব্রত বাইন গ্রেপ্তার হয়ে কুমিল্লা কারাগারে যাওয়ার পর তার সঙ্গে প্রায়ই দেখা করতেন তার মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন। আর এই খাদিজাই সুব্রত বাইনের সহযোগী মেহেদী হাসান, মধু বাবুসহ বিভিন্নজনকে বার্তা পৌঁছে দিতেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাইনের অবর্তমানে মেরুল বাড্ডার মাছের আড়তটি নিয়ন্ত্রণ করতেন মেহেদী হাসান। এ ছাড়া গাড়ির শো-রুমে, তৈরি পোশাক কারখানায়সহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি ও ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন দীপু। সুব্রত বাইনের হয়ে একে একে রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, বারিধারা ও গুলশান এলাকার বেশির ভাগ অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণে নেন দীপু। এ ছাড়াও বাড্ডা, ভাটারাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করতেন দীপু ও তার সহযোগীরা। তারা বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্রও ভাড়া দিতেন।
মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তারের সময় উত্তর বাড্ডার ওই বাড়ি থেকে অস্ত্র, গুলি ছাড়াও পিস্তলের ৮টি ম্যাগাজিন, ৩২টি কার্তুজ, একটি ২২ উজি মেশিনগান রাইফেল, উজি রাইফেলের দু’টি ম্যাগাজিন, তিনটি চায়নিজ কুড়াল, একটি টাইগার হান্টিং কমান্ডো চাকু, দু’টি ওয়াকিটকি, একটি ওয়াকিটকির ব্যাটারি, তিনটি পিস্তলের সাইড কভার ও একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।
দীপুর সঙ্গে বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার ভাই আলমগীরেরও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবি বলছে, দীপু ও তার সহযোগীদের কাছেও অস্ত্র রয়েছে। অস্ত্রগুলো মূলত সুব্রত বাইন ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের। গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবুর কাছেও আরও ১৩ থেকে ১৪টি অস্ত্র রয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল থানাধীন নয়াটোলা মোড়ল গলির ‘দি ঝিল ক্যাফে’র সামনে যুবদল নেতা মো. আরিফ সিকদারকে গুলি করা হয়। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সুব্রত বাইনের সহযোগীরা জড়িত ছিল। এ ছাড়াও গত বছরের ২০ মার্চ গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সুমন নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যাসহ একাধিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত এই দীপু।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক কামাল হোসেন বলেন, শনিবার বিকেলে দীপুকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার উপ-পরিদর্শক সুমন মিয়া তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি দীপুসহ অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে গোপনে বাড্ডা-ভাটারা থানা এলাকাসহ মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় চলছিল। দীপুর বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাকে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এলোমেলো তথ্য দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য এবং মামলার অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিদের নাম-ঠিকানা জানতে দীপুকে সাতদিনের রিমান্ডে নেয়া প্রয়োজন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, শুক্রবার মেহেদী হাসানকে অস্ত্র, গুলিসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতে হাজিরের পর বর্তমানে তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
এদিকে, শনিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, নির্বাচনী পরিবেশ অস্থিতিশীল করার জন্যই এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুত করা হয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার দিবাগত রাত ২টায় রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকার পোস্ট অফিসপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ৭টি পিস্তল, ৩টি রিভলবার, ২টি এয়ারগান, ১টি ০.২২ মিমি বোরের রাইফেল, ২টি রাইফেল ম্যাগাজিন, ৮টি পিস্তল ম্যাগাজিন, ৩৯৪ রাউন্ড পিস্তল অ্যামুনিশন, ৩০ পিস কার্তুজ, ২ সহস্রাধিক এয়ারগান প্যালেটস, ১টি দূরবিন, ৪টি পিস্তল গ্রিপ সাইট কভার, ৩টি চাইনিজ কুড়াল, ১টি বিদেশি ছুরি, ২টি ওয়াকিটকি সেট, ১টি ওয়াকিটকি ব্যাটারি এবং ১টি ল্যাপটপ (চার্জারসহ) উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে দীপুকে আটক করে থানায় সোপর্দ করা হয়।




