চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চাকসু নেতাদের হেনস্তা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে চাকসু নেতাদের নেতৃত্বে শারীরিক হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে তিনি আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংগঠন হলুদ দলের একাংশের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সামনে চাকসুর চার নেতার নেতৃত্বে ওই শিক্ষককে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে তাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

হেনস্তার শিকার শিক্ষকের নাম হাসান মোহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টর।

ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এক মিনিট সাত সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ছাত্র শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একজনকে পেছন থেকে তাঁকে চেপে ধরতেও দেখা যায়। ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে শনাক্ত করা গেছে। এ সময় শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে চিৎকার করতে দেখা যায় এবং পরে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রক্টর অফিসে অবরুদ্ধ অবস্থায় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হাসান মোহাম্মদ বলেন, ‘পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের সময় শিক্ষক ও কর্মচারীরা তাঁকে জানান যে ‘পরিস্থিতি ভালো নয়’। এরপর তিনি কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। তখন চাকসু নেতারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এরপরও তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি এবং তাঁর বিরুদ্ধে মব তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।’

চাকসুর আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেন, সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালে হাসান মোহাম্মদ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে ভূমিকা রেখেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি সরাসরি গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত চলছিল। তদন্ত চলাকালে কেন একজন অভিযুক্ত শিক্ষক পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন করছেন, তা জানতে তাঁরা আইন অনুষদের ডিনের সঙ্গে কথা বলতে যান। এ সময় তাঁদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ওই শিক্ষক পালানোর চেষ্টা করেন এবং দৌড়ানোর সময় গাছের গুঁড়িতে আঘাত পেয়ে পড়ে যান।

একই দাবি করেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন, ‘তাঁকে কোনোভাবেই মারা হয়নি। আমরা আইন অনুষদে পরিদর্শনের সময় তাঁর উপস্থিতির খবর পেয়ে সেখানে যাই। তিনি গ্যালারির পেছন দিয়ে দৌড়ানোর সময় ব্যথা পান।’

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আমি এক দিনের জন্যও বাইরে বের হইনি। কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌন মিছিলেও অংশ নিইনি। শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করেছে—এমন কোনো বোর্ডের সদস্যও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি কাউকে মামলা দিইনি।’

ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সমন্বয়কারী মো. ইকবাল শাহীন খান বলেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্ত চললেও সিন্ডিকেট থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেন। সে কারণেই তাঁকে পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সব পরীক্ষায় তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। হট্টগোলের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই। বর্তমানে তাঁর মুঠোফোন তল্লাশি করা হচ্ছে এবং সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরে গণমাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে। কীভাবে তিনি পরীক্ষার দায়িত্ব পেলেন, তা আমি বলতে পারছি না।’

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025