আশিক ম্যাজিক ও আরব্য রজনীর ‘বিনিয়োগ’ কেচ্ছা!

বইয়ের আলমারিতে রূপকথা আর ক্লাসিক সাহিত্যের ভিড়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার আমলে একটি নতুন নাম যুক্ত হয়েছিল, আশিক চৌধুরীর সিভি। যারা সেই সিভির পাতা উল্টেছেন, তারা নাকি এর ‘ভার’ সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছেন। আরব্য রজনীর ১০০০ গল্পের মতো সেই প্রোফাইলের পরতে পরতে কেবলই সাফল্যের ঝিলিক। তার আশিকানরা (ভক্তকুল) ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে এমনভাবে স্ট্যাটাস দিচ্ছিলেন, যেন আশিক ভাই বিডার চেয়ারে বসা মানেই পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যাবে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের চেয়েও বেশি বিনিয়োগে হাঁসফাঁস করছে। কিন্তু মাস যায়, বছর ঘোরে, বিনিয়োগের জাহাজ তো দূরে থাক, কাগজের নৌকাও পটুয়াখালীর খালে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমাদের ‘মেধাবী’ আশিক সাহেব দায়িত্ব নিয়েই ঝোলা থেকে বের করলেন নানা কৌশলী শব্দ। ‘এফডিআই হিটম্যাপ’, ‘ডাটা ড্রিভেন স্ট্র্যাটেজি’, সব যেন সায়েন্স ফিকশন মুভির সংলাপ। দেশের বিনিয়োগকারীরা যখন হামলা-মামলা আর ব্যাংকের ‘দেউলিয়া’ তকমা নিয়ে নাভিশ্বাস তুলছেন, তখন তিনি হাসিমুখে শোনালেন এক অলৌকিক গল্প। তিনি বললেন, বিনিয়োগ নাকি বেড়েছে! এটাকে তিনি বলছেন ‘মিরাকল’।

হ্যাঁ, মিরাকলই তো! কারণ সাধারণ মানুষ যেখানে দেখে নতুন বিনিয়োগ (ইকুইটি ক্যাপিটাল) গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, সেখানে আশিক সাহেব জাদুর চশমা দিয়ে দেখছেন ‘নিট বিনিয়োগ’ ঊর্ধ্বমুখী। পুরোনো কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগ করা মুনাফাকেই ‘নতুন জোয়ার’ বলে চালিয়ে দেওয়াটা সত্যিই আরব্য রজনীর সেই সিন্দাবাদের গল্পের মতো রোমাঞ্চকর। যেখানে বাস্তবতা বলছে বিনিয়োগ প্রস্তাব ৫৮ শতাংশ কমেছে, সেখানে বিডার জাদুকর বলছেন, ওগুলো তো ছিল ‘ভুয়া’ নিবন্ধন, আমি তো আসল জহুরি!

এপ্রিলের সেই চার দিনের জাঁকজমকপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনের কথা মনে আছে? ৫০টি দেশের প্রতিনিধি, পাঁচ তারকা হোটেলের এলাহি কারবার আর চারদিকে শুধু ‘আশিক ম্যাজিক’-এর জয়জয়কার। সম্মেলন শেষে ঘোষণা এলো ৩,১০০ কোটি টাকার প্রস্তাবের। অথচ দেশের একেকজন ব্যবসায়ীই নাকি তিন-চার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ক্ষমতা রাখেন। যাদের ঘরে খাবার আছে, তাদের দাওয়াত না দিয়ে সাহেব সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের ডাইনোসরদের পেছনে ছুটলেন। ফল যা হওয়ার তাই হলো, গর্জন অনেক হলো, কিন্তু এক ফোঁটা বৃষ্টিও বাংলার জমিনে পড়ল না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই ‘পোস্টার বয়’ আমলাদের বাইরে থেকে এসেছিলেন একরাশ আশা নিয়ে। লোকে ভেবেছিল তিনি এসে সিস্টেমের জং ধরা কলকবজা ঠিক করবেন। কিন্তু তিনি ব্যস্ত রইলেন বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া আর হাই-প্রোফাইল মিটিংয়ের ছবি তোলায়। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, ব্যাংক ঋণের সুদ ১৫ শতাংশের উপরে, এদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। পাড়ার মোড়ের দোকানদারও জানে স্থিতিশীলতা ছাড়া কেউ টাকা ঢালে না, কিন্তু আমাদের হাই-ফ্লাইং চেয়ারম্যান সাহেব এফডিআই হিটম্যাপ দিয়ে মশা তাড়াতে ব্যস্ত।

সবচেয়ে বড় চমক হলো, দুই বছর আগে যে পাকিস্তান আমাদের ধুলোবালি দেখত, তারাও নাকি এখন আমাদের চেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে। আশিকানরা হয়তো বলবেন, “এটাও আশিক ভাইয়ের কোনো সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান।” আসলে আরব্য রজনীর গল্পের শেষে যেমন শেহজাদ বেঁচে যান, তেমনি আমাদের আশিক সাহেবও সম্ভবত তার ‘লজিস্টিকস ডিল’ আর সাবলীল ইংরেজি দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারী যারা ‘রাজনৈতিক সরকারের’ প্রহর গুনছেন, তাদের জন্য এই ‘সিভি-সর্বস্ব’ শাসনকাল কেবল এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকবে।

আপনারা যারা কলামটি পড়ছেন, প্লিজ কেউ আশাহত হবে না, নৈরাশ্যের মাঝেও আশার আলো আছে, বিনিয়োগের চাকা না ঘুরলেও আশিক চৌধুরীদের প্রোফাইলের চাকা ঠিকই বনবন করে ঘুরবে। দেশ বিনিয়োগে ভাসুক না ভাসুক, অন্তত আশিকানদের স্ট্যাটাসের বন্যায় ফেসবুক তো ভেসে যাবে… এটাই বা কম কী? তা দেশ সে গোল্লায় যাক!

Tags :

Anamul Haque

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025