ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিসিবিতে যে হস্তক্ষেপ করেছেন, এটা তিনি নিয়ম অনুযায়ী পারেন না। কারণ বিসিবি একটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটা সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান নয়। এর নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও নিজস্ব পরিচালনা পরিষদ রয়েছে। এটা কোন কোম্পানি আইন দ্বারাও পরিচালিত নয়, নয় কোন ট্রাস্ট আইন দ্বারাও পরিচালিত।
বিসিবি পরিচালনা হয় নিজস্ব গঠনতন্ত্র দিয়ে। এর কার্যক্রমের তদারকি ও এতে নিজেদের প্রতিনিধি থাকলেও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদেরও (এনএসসি) ক্ষমতা নাই বিসিবির কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা। কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ারও ক্ষমতা নাই এখানে কারও। বিসিবিতে সরকারের সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সরকার এখানে প্রভাব রাখে শুধু এনএসসির দ্বারা।
বিসিবির যে গঠনতন্ত্র, এটাও পরিবর্তন করতে পারে না ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এমনকী কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা এনএসসিও পারে না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বিসিবি নিজেই গঠনতন্ত্র সংশোধনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অর্থাৎ সরকার সরাসরি এখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
আইসিসি বিভিন্ন দেশের ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি হস্তক্ষেপকে কঠোরভাবে দেখে। এরআগে শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুয়েসহ বিভিন্ন দেশের ওপর আইসিসির নিষেধাজ্ঞা আমরা দেখেছি, এবং এগুলো হয়েছে ক্রিকেটে দেশগুলোর সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে।
এবার ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমান ইস্যুতে বাংলাদেশের ইন্তেরিম সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যা করেছেন, এটা ক্রিকেটে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ। বিশ্বকাপে দল না পাঠানোর প্রকাশ্য নির্দেশনা দিতেও দেখেছি আমরা তাকে ফেসবুকে। তার নির্দেশ প্রতিপালনে বিসিবি সে অনুযায়ী চিঠিও দিয়েছে আইসিসিকে। এখানে আইসিসিকে বিসিবির যে চিঠি, সে বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিজস্ব সিদ্ধান্তের কোনো চিঠি নয়, এটা সরকারি নির্দেশনায় হয়েছে।
ইএসপিএন-ক্রিকইনফো যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে—আইসিসি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধকে গ্রাহ্য করেনি। উলটো পয়েন্ট কেড়ে নেওয়ার কথা বলছে। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচ রয়েছে ভারতে। আইসিসি যখন বাংলাদেশের অনুরোধ রাখবে না বলে জানাচ্ছে, তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি, ইংল্যান্ড ও নেপালের বিপক্ষে চারটি ম্যাচ থেকেই পয়েন্ট হারাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ গ্রুপ পর্বেই কোনো ম্যাচ না খেলেই বাদ পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
বিসিবিতে সরকারি এই হস্তক্ষেপের কারণে এতে বাংলাদেশের সর্বনাশ হয়ে গেল। এটা হতে যাচ্ছে কেবল একজন উপদেষ্টার অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত ও ফেসবুকের লাইক কামানোর অভীপ্সা থেকে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
উপদেষ্টা আসিফের এই ফেসবুক স্ট্যাটাস ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বিসিবিতে সরকারি হস্তক্ষেপে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই সর্বনাশের একটা জায়গা বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারা, অন্য সমস্যার হতে পারে ভবিষ্যতে। এর জের ধরে আইসিসি থেকে নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে পারে বাংলাদেশ।
উপদেষ্টা আসিফের নির্দেশনাকে কি এখানে অগ্রাহ্য করতে পারত না বিসিবি? পারত, যদি মেরুদণ্ডখানা জায়গামতো থাকত। বিসিবির প্রেসিডেন্ট আমিনুল ইসলাম বুলবুল ক্রিকেটার হিসেবে ছিলেন আমাদের পছন্দের, এবং অন্য উচ্চতার; কিন্তু প্রশাসক হিসেবে তিনি অন্তত সেই উচ্চতাকে ধরে রাখতে পেরেছেন বলে প্রমাণ হয়নি। একটা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার যে ব্যক্তিত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা-যোগ্যতার দরকার ছিল, তার অভাব প্রকট রূপে ধরা পড়েছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক একটা ক্ষুদ্র সমস্যাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে অনাহুত উত্তেজনা ও অযাচিত প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন রীতিমতো ক্রসরোডে। আমাদের সামনে এখনই কেবলই অন্ধকার।
সাংগঠনিক দক্ষতা আর ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’ দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ২০০০ সালে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পেয়েছিল আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ। ফেসবুক লাইকের নিদারুণ আকাঙ্ক্ষা, সাংগঠনিক অদক্ষতা, ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা এবং অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপে সে মর্যাদা আজ পড়ে গেল শঙ্কায়।




