জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার করতে যাচ্ছে ‘গণভোট’। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে এটা বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করছে সরকার এবং সরকারের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণকারীরা।
গণভোটে যে চার বিষয় আর এক উত্তর—এর অর্থ ‘হ্যাঁ’ বলা মানে সবগুলোতে ‘হ্যাঁ’; আর ‘না’ মানে সবগুলোতে ‘না’। এটা অনেকটাই কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিকে আইনজীবীর প্রশ্ন আপনাকে ‘হ্যাঁ/না’ একটা মাত্র শব্দে উত্তর দিতে হবে, অন্য কিছু বলার সুযোগ নাই, সে স্বাধীনতা আপনার নাই।
চার প্রশ্নে একটা মাত্র এক শব্দের উত্তর মানে ‘লাইন অব ফায়ার’; গুলির নিশানা তোমার দিকে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ তোমার নাই।
এই যে চার বিষয়, সেখানে আছে গণভোট অধ্যাদেশের তফসিলে উল্লিখিত ৩০টি প্রস্তাব, যা সকল দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত বলে দাবি করা হয়েছে। অথচ এটা মিথ্যা বয়ান। আমি লাইন ধরে ধরে দেখিয়ে দিতে পারব যে, এখানে থাকা ত্রিশের মধ্যে একুশটিতে রয়েছে বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অথবা পুরোটা কিংবা খানিকটা ভিন্নমত।
আমরা জানি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ মানে ‘আপত্তিপত্র’ অথবা ‘ভিন্নমত পোষণ করা’। আলী রীয়াজদের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যে সব প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করেছিল, সেই সব ভিন্নমতকে অগ্রাহ্য করে কমিশন অথবা সরকার গণভোট অধ্যাদেশের তফসিলে এটাকে দেখিয়ে দিয়েছে ‘ঐকমত্য’। এটা সকল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া সকল দলের প্রতি একটা অপমান। বাস্তবায়ন আদেশের কথা আছে আবার, যেখানে নতুন কিছু আরোপ করা হয়েছে যা নিয়ে বৈঠকে আলাপই করেনি কমিশন। এমন অভিযোগ করেছে খোদ বিএনপিই।
রাজনৈতিক দলগুলো এখন এমনই একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, বৈঠকে ‘ভিন্নমত’ দিলেও অধ্যাদেশের তফসিলকে মেনে নিতে হচ্ছে, অথবা অপমানটা গিলে ফেলতে হচ্ছে। বসতে হচ্ছে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটে।
যে বিষয় উল্লেখপূর্বক গণভোট তাতে সকল দলের সকল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অগ্রাহ্য হতে যাচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’-কে জিতিয়ে তারা তাদের নিজেদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’-কে ‘না’ বানিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতার পথে। এখানে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সকল দলের আগের সকল আপত্তি ‘Null and void.’ এমনকি বিএনপি-জামায়াতের আপত্তিগুলোও বাতিল হয়ে যাচ্ছে, চলে আসছে প্রতিপালন ও বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা। যে অঙ্গীকারনামায় সই করে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাস্তবায়নের, সে দস্তখত এখন দাসখত হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়। এছাড়া আর উপায় নেই তাদের।
৩০ দল ও জোট ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ রচনা প্রক্রিয়ায় ছিল। এদের মধ্যে এনসিপিসহ ৫টি দল এতে সই করেনি। তবে এনসিপি হচ্ছে সে চার দলের একটা দল, যারা জুলাই সনদের কোন প্রস্তাবেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। কোনো নোট অব ডিসেন্ট না দেওয়া অপর ৩ দল হচ্ছে—বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট।
সত্যি কথা বলতে কী জুলাই সনদ হচ্ছে এই চারটা ক্ষুদ্র দল ও সরকারের কর্মসূচি। অন্য যারা এখন ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বলছে, এরা হয় প্রতারণা করছে, নয়তো প্রতারিত হয়েছে, না-হয় নিজেদের মেরুদণ্ড খুঁজে পাচ্ছে না, অথবা মেরুদণ্ডের আবশ্যকতা বুঝতে পারছে না। কারণ এখন যদি তারা আপত্তিতেও সম্মতি জানায়, তবে কমিশনের বৈঠকে আপত্তি করল কেন তারা? এটা কি দ্বিচারিতা নয়?
যেকোনো রাজনৈতিক দলের এগিয়ে যাওয়ার এবং দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে প্রতারণা না করা, নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখা, এবং প্রতারিত না হওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করা। এটা করতে ব্যর্থ সকল দলই। তারা চাপের মুখে হোক, আর মেরুদণ্ডের অস্তিত্বহীনতায় হোক, নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এক্ষেত্রে তারা যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে চায়, তবে তার আগে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে কমিশনের বৈঠকে দেওয়া সকল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রত্যাহার করুক। এতে অন্তত জবাবদিহি নিশ্চিত হবে তাদের।
তবে এই জুলাই সনদ যে স্রেফ কাগুজে এক দলিল এর প্রমাণ প্রথম সুযোগেই দিয়ে রেখেছে রাজনৈতিক দলগুলো। জুলাই সনদের একটা অন্যতম শর্ত ছিল ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন। এটা তারা অগ্রাহ্য করেছে। এই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে যত যাই দাবি করা হোক না কেন, এর আইনি ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ, এটাকে তাই আমি ‘লঙ্ঘন’ বলব না। এটা বলা যায়, পাত্তা না দেওয়া; কোনো দলই এই জুলাই সনদকে পাত্তা দেয়নি; এমনকি যে চারটি দল বৈঠকে বসে—“সাহেব কহেন, ‘চমৎকার! সে চমৎকার!’/ মোসাহেব বলে, ‘চমৎকার সে হতেই হবে যে!/ হুজুরের মতে অমত কার’?” নীতিতে ছিল, তারাও এটাকে পাত্তা দেয়নি।
গণভোটে ‘হ্যাঁ/না’ তাই কেবল রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটা আত্মসম্মানবোধেরও। অবশ্য টের পাওয়ার মতো আত্মসম্মানবোধটাও জরুরি এখানে!
কবি শঙ্খ ঘোষের একটা বিখ্যাত কবিতা ‘হামাগুড়ি’।
“কি খুঁজছেন?
মিহি স্বরে বললেন তিনি: মেরুদণ্ডখানা।
সেই মুহুর্তে বিদ্যুৎ ঝলকালো ফের।
চমকে উঠে দেখি: একা নয়, বহু বহু জন, একই খোঁজে হামা দিচ্ছে এ-কোণে ও কোণে ঘর জুড়ে।”
কবিরা আসলে এমনই, স্বকালে বসে লেখেন মহাকালের কবিতা, যা চিরকালীন সত্য হয়ে সামনে আসে বারবার। খুঁজবেন কেউ?
গণভোটে ‘হ্যাঁ/না’ যাই জিতুক—আমাকে আগ্রহী করছে না; আমার আগ্রহ কেবলই মেরুদণ্ডে! আমি আমার মেরুদণ্ডে হাত দিয়ে, দেখতে বসেছি অন্যের অবস্থা!




