সাড়ে চার মাসে নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত ১০

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে সাত শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫০৩ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন।

রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ-পরবর্তী’ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম ও প্রোগ্রাম অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম পৃথক দুই প্রতিবেদনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিক, ১৫০টির বেশি স্থানীয় পত্রিকা এবং জেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের ঘটনাবলি নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।

সহিংসতার চিত্র

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক সাত শতাধিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৫০৩ জন আহত এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে কমপক্ষে ৩৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনি কার্যালয় ও ভোটকেন্দ্রে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

বিভিন্ন দল ও মনোনীত প্রার্থী এবং বঞ্চিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দল, হামলা, ভোটারকে হুমকি, ভোট প্রদানে বাধা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, নারী নির্যাতন, হেনস্তা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনায় এসব হতাহত হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ২৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ৬৫০ জন আহত এবং পাঁচ জন নিহত হন। একই সময়ে ২৪ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ হন এবং ২০০টির বেশি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ভোটের দিনের চিত্র

প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ভোটের দিন সারা দেশে ৩৯৩টি অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ছিল, ১৪৯টি কেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা, ১০৫টি সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ৫৯টি ব্যালট স্টাফিংয়ের অভিযোগ, ১৯টি পোলিং এজেন্ট অপসারণ, ১৩টি নির্বাচনি কর্মকর্তার গাফিলতি, ১৮টি ভোটারকে বাধা, ছয়টি প্রার্থীর ওপর হামলা, তিনটি ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও দুটি অগ্নিসংযোগ।

৩১টি অন্যান্য অনিয়ম

ভোটের দিন সংঘর্ষে ১৪৫ জন আহত হন। ৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অনিয়মের অভিযোগে ১৩ জন প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয় এবং আচরণবিধি ভঙ্গের ৫৫টি ঘটনায় কারাদণ্ড বা জরিমানা দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পাঁচ জন সাংবাদিক আহত হন এবং তিনটি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা হয়।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানোর ৬৪টি ঘটনার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ

সংস্থাটি জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ৬৪ জেলায় ৫৬৫ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়। তারা ১০০টি আসনের ১ হাজার ৭৩৩টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেন। ভোট গণনার সময় ৩৪৭ জন পর্যবেক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

তবে ৪৮ জন পর্যবেক্ষককে গণনাকক্ষে প্রবেশে বাধা দেওয়া বা অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন ও গণভোট শেষে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পৃথক তিন ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ ও বাগেরহাটে দুই যুবক এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে এক শিশু নিহত হয়।

বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ৩০ জেলায় দুই শতাধিক সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। ৩৫০টির বেশি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

নারী সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ

তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩২টি ঘটনায় ৪৫ জন নারী হেনস্তার শিকার হন এবং ২৩ জন আহত হন। হেনস্তার শিকারদের মধ্যে ৩৯ জন জামায়াত সমর্থক, একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং পাঁচ জন অজ্ঞাত রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩২টি ঘটনার মধ্যে ৩১টিতে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। একটি ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়।

এছাড়া নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।

সুপারিশ

এইচআরএসএস সব ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের জবাবদিহি ও শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন– সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ইনভেস্টিগেশন অফিসার তামিম দুদায়েভ খান, ডকুমেন্টেশন অফিসার আব্দুল কাদির প্রমুখ।

Tags :

News Desk

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025