নিষিদ্ধ হওয়ার মুখে পড়া আওয়ামী লীগ কীভাবে ফিরবে?

সুবর্ণ সুযোগ হাতে পেয়ে ‘চিরশত্রু’ আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। আওয়ামী লীগ এই ভয়াবহ সংকট কীভাবে মোকাবেলা করবে তার সমাধান দেওয়া ব্যক্তি মনজুরুল হকের এক্তিয়ারে পড়ে না কারণ, সে আওয়ামী লীগের কেউ নয়। একজন Geo-Political Analyst হিসেবে নিবন্ধ লেখক শুধুমাত্র Strategic solutions উল্লেখ করতে পারে। তা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা গ্রহণ করবেন এমনটিও লেখক মনে করে না।

আজকে যে বিএনপি স্থায়ীভাবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে চলেছে তার আগে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডে’ দলটির ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর নেতাদের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার কথা বলে ২০২৫ সালের ১২ই মে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এজন্য তারা অবৈধভাবে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’-এর ১৮ ধারায় একটি উপধারা যোগ করে কারণ, ওই ধারায় কোনো দলকে নিষিদ্ধের বিধান ছিল না।

ইউনুসের অবৈধ সরকার আওয়ামী লীগের সকল কার্যক্রম―মিটিং-মিছিল-সমাবেশ-সংবাদ সম্মেলন-পোস্টারিং, দেওয়াল লিখন, প্রেস-রিলিজ, ডিজিটাল এবং প্রিন্ট গণমাধ্যমে প্রচার নিষিদ্ধ করে। অফিস ও ব্যাংক হিসাবও জব্দ করে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করেছে।, যার ফলে তারা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। অর্থাৎ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।

নির্বাচনের আগে বিএনপি’র একাধিক শীর্ষ নেতা একাধিকবার বলেছেন-‘তারা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধের পক্ষে নয়’। এমনকি দলনেতা তারেক রহমান বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন ‘আমরা কোনো দলের নিষিদ্ধ চাই না, এটা একটা বাজে উদাহরণ হবে, এর ধারাবাহিকতায় একসময় আমাদের দলও নিষিদ্ধ হতে পারে’। কিন্তু ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি সরকার এই নিষেধাজ্ঞাগুলো বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি নিষিদ্ধাদেশ অমান্য করলে কি কি শাস্তি হতে পারে তার বিধান তৈরি করার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছে। সরকার নতুন আইনের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যাতে দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরার আইনি পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

বিএনপি নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের মত গুরুতর বিষয়ে ভারত, জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থাসহ পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ ও সংস্থার সতর্কবার্তার কারণে নির্বাচনের আগে এমন কিছু ইতিবাচক বিবৃতি দেয় যাতে করে মনে হয়েছিল বিএনপি ইউনূসের বেআইনী ফ্যাসিবাদী শাসন রদ করে একটি গণতান্ত্রিক বাতাবরণ তৈরি করবে। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে জামায়াতে ইসলামিকে নির্বাচনে জেতানোর উদ্যোগ নিলে ভারত নিজেদের নিরাপত্তার বিপদাশঙ্কা করে জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে মৌন কিংবা প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিল।

এর ফলে আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ এবং সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় বিএনপিকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে। আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভোটাধিকার হরণ এবং তাদের ভোট ট্রিক্সে ফেলে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

এখন সেই বিএনপি আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী করতে যাচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে ৪ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান জারি করতে চলেছে। এতে করে জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করে উল্লেখ করেছেন যে, একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর একটি গুরুতর অপরাধ এবং এই নিষেধাজ্ঞা বলবত রাখার জন্য সরকারকে কারণ দর্শানোর আল্টিমেটামও দিয়েছে।

ভারত সরকারও বিএনপির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অতীত রেকর্ড জেনেও তাদের কাছে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং ভারতবিরোধী ন্যারেটিভ দূর করার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এর পরিণতিতে কি হতে পারে?

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরবর্তী পরিণতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনি ব্যবস্থার এক গভীর সংকট সৃষ্টি হবে।

• ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটের পর, সরকার ‘জুলাই সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করছে। এতে এমন ধারা রয়েছে যা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে’ জড়িত যেকোনো দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে পারবে।

• আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সমগ্রিকভাবে দল দোষী সাব্যস্ত হলে তার সম্পদ স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তার নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত বাজেয়াপ্ত করা হবে।

• আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে সেই শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ করে দিয়েছে। জামায়াত ইতোমধ্যেই প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পুরোপুরি আওয়ামী লীগ শূন্যতায় তাদের বিকাশ এতটাই দ্রুত এবং বিনা বাধায় হতে পারে যা উপমহাদেশের জন্য অশনিসংকেত।

• জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি প্রধান দলকে বাদ দিলে তার সমর্থক গোষ্ঠী গোপন আন্দোলন বা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

• এর ফলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি হলো শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়বে। আবার ভারত প্রত্যর্পণের কথা আমলে না নিয়ে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতা সোচ্চার রাখতে চাইছে। যে কারণে ইউনূসের অধ্যায় শেষে যে সুসম্পর্কের আভাস দেখা যাচ্ছিল তা আবার কালো মেঘে ঢেকে দিয়েছে।

এখন আওয়ামী লীগ কি করতে পারে? তাদের কৌশলই বা কি হতে পারে?

• শেখ হাসিনা নির্বাসন থেকে যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিলের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করেছেন।

• তারা দাবি করেছে যেকোনো নির্বাচন বর্তমান প্রশাসনের পরিবর্তে একটি ‘নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে অনুষ্ঠিত হোক এবং তাদেরকে নির্বাচনে লড়বার সুযোগ দেওয়া হোক।

• দেশের ভেতরে তাদের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করায় আওয়ামী লীগ বিশ্বমঞ্চের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে আইসিসি’তে মামলাও হয়েছে নিষেধাজ্ঞা ও শেখ হাসিনার মৃত্যুধণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে।

• নিষেধাজ্ঞা, সুষ্ঠু বিচারের অধিকার এবং লক্ষ লক্ষ ভোটারের ‘ভোটাধিকার হরণ’ সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগগুলোকে দলটি কাজে লাগাতে চাইছে।

• ভারত থেকে শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল ভাষণ দিয়ে চলেছেন, তার প্রথম প্রকাশ্য ভাষণটি হয়েছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যেখানে তিনি নিজেকেই বৈধ নেতা হিসেবে দাবি করছেন এবং বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।

এতক্ষণ যে আলোচনা হলো সেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। এর চেয়ে ভয়াবহ যে সংকটটি ইদানিং দৃশ্যমান হচ্ছে, তা অভ্যন্তরীণ সংকট। ইউনূসের অবৈধ ইন্টেরিম সরকার ১৮ মাস ধরে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের একচ্ছত্র ক্ষমতাপ্রদর্শন, ইন্টেরিম ও তাদের ভাঁড়দের ভাষায় ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসন চালিয়েছিল, তাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল ইউনূসের সরকারের চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অত্যাচার-নিপীড়ন, টাকা পাচার, মবভায়েলেন্স এবং অবৈধ ক্ষমতার বেআইনী আইন জারি করে গণনিপীড়নে।

সে কারণে খুব অল্প দিনেই আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের সিম্প্যাথি তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনার শাসনের সঙ্গে তুলনা করে মানুষ আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলের অধিকাংশ ‘অপরাধ’ ক্ষমা করে দিয়েছিল বা ভুলে গিয়েছিল।

কিন্তু নির্বাচনের মাস দুই আগে ভারতের স্ট্র্যাটিজিক্যাল ভুল এবং আওয়ামী লীগের বিএনপির প্রতি বায়বীয় আস্থা রাখা ও সে আলোকে সমর্থকদের মৌনভাবে জামায়াত ঠেকাতে বিএনপিকে ‘মন্দের ভালো’ নীতি অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত ব্যুমেরাং হয়েছে।

তার উপর বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের আয়েশি কার্যকলাপ, দেশের তৃণমূল কর্মীদের ওপর হওয়া অত্যাচার-নিপীড়নের কার্যকর প্রতিরোধে না নামা এবং কোনো এক বায়বীয় শক্তির সহায়তায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রত্যাবর্তনের আশা দেশের সাধারণ কর্মীদের চরমভাবে হতাশ করেছে।

বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে আওয়ামীলীগে বিএনপি ও জামায়াতের চর ঢুকেছে বাধাহীনভাবে। ওদিকে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নাম ভাঙিয়ে আওয়ামীলীগের ৭৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস শেষ দশ বছরে ধসে গিয়েছিল।

মাফিয়া বিজনেস কাবাল গ্রুপ আওয়ামীলীগকে ‘দখল’ করেছিল। পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে দায়দায়িত্বহীন প্রশাসনকে দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, যত্রতত্র মুজিবের ব্যবহার জাতির পিতার ভাবমূর্তি ও অর্জনকে হালকা করেছে।

তেলবাজ রাজনীতিক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়া একদল স্তাবক, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতাহীন শহুরে এলিটদের দৌরাত্ম্য, হেফাজতের মত উগ্র ধর্মবাদী গণতন্ত্রবিরোধীদের সঙ্গে অতিরিক্ত দহরম-মহরম-এর মাশুল দিচ্ছে আজ প্রায় ৫ কোটি আওয়ামীলীগ সমর্থক। এই হাইব্রীড আওয়ামী লীগারদের (যাদের অনেকেই শেখ পরিবারভূক্ত) ক্ষমতার মোহ আওয়ামী লীগকে পচন ধরিয়েছিল। নিজেদের স্বার্থের জন্য এরা বারবার শেখ হাসিনা শেখ মুজিবকে ‘কমোডিটিজ’ বানিয়ে বিক্রি করেছে। সর্বশেষ এরাই শেখ হাসিনাকে একা মৃত্যুর মুখে ছেড়ে এদের অধিকাংশই পালিয়েছে।

যারা নিজেদেরকে ‘শেখ হাসিনার চেয়েও বড় লীগার’ ভাবতে শুরু করেছিল সেই তারাই গত ১৮ মাসে আওয়ামীলীগকে আবার অর্ধেক ডুবিয়ে দিয়েছে। যে জনসমর্থন ৫ আগষ্টের পর শুরু হয়েছিল তাতে আবার ভাটা পড়েছে।

যেহেতু দেশে প্রথমে ইউনূসের, এবং এখন বিএনপি’র নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে দেশে অবস্থানরত কর্মীরা রাস্তায় নামতে পারছে না, বনে-বাদাড়ে ঘুরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, সর্বক্ষণ গ্রেফতারের ভয়ে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারছে না, সেসময় বিদেশে অবস্থারত নেতাদের ডিজিটাল মাধ্যমে যে দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিৎ ছিল তা পারছেন না বা রিস্ক নিয়ে করতে চাইছেন না।

যে কেউ ডিজিটাল মাধ্যমের টকশো’তে লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বক্তব্য খেয়াল করলে অবাক হবেন! ধরুন এই যে ইউনূসের নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞাকে সংসদে বিল হিসাবে তুলে কিছু সংশোধন (শাস্তির বিধান রেখে) করে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাদের কর্মকৌশল কী? প্রশ্ন করলে প্রথমেই তারা শুরু করবেন সেই যুক্তফ্রন্ট আমল থেকে ৬৬ সালের ৬ দফা, অসহযোগ আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মম মৃত্যু, পরবর্তীতে ‘তীব্র আন্দোলন’ করে ব্রাকেটমুক্ত লীগের পুনর্জন্ম, ২১ বছর পর জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতারোহন বয়ান করবেন।

এরপর ধারাবাহিকভাবে ১৯৯৬ থেকে কীভাবে কোন কোন দুর্বিপাক সামলে দল চালাতে হয়েছে সেই বিবরণ দিয়ে, বার বার পরাজিত হয়ে আবার ফিনিক্স পাখির ছাই থেকে উঠে আসার বর্ণনা দেবেন। ২০০৯ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কি কি উন্নয়ন করে দেশকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন সেই স্তুতিবাক্য আউড়ে যাবেন। তারপর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করবেন-‘আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। এই দল জনগণকে সাথে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আবার ক্ষমতাসীন হয়ে দেশকে পতনের হাত থেকে বাঁচাবেন। আওয়ামী লীগ কখনও পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতা প্রত্যাশী নয়’। উপস্থাপক না থামানো পর্যন্ত এই কেচ্ছা বলতে থাকবেন।

এখানে বর্তমান ভয়াবহ সংকটের সমাধান কোথায়? দল পার্মানেন্টলি ব্যান হতে যাচ্ছে, এই সময় তাদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হওয়া উচিৎ কীভাবে এর মোকাবেলা করবে সেটা। তারা যে কৌশলের কথা বলবেন তা যে প্রতিপালিত হবে এবং সফল হবে তেমন না হোক, অন্তত জনগণকে তো জানাতে হবে-তারা এখনও নিঃশেষ হয়নি! তাদের প্ল্যান A, B,C থাকতে হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কি কি পদক্ষেপ নেবেন সেটা পরিষ্কার করে বলতে হবে।

সেসব না বলে ক্ষমতায় ফিরলে কাকে কাকে কীভাবে শায়েস্তা করা হবে, কোন কোন লালবদরের ক্ষমা নাই, লিস্ট করে রাখা হচ্ছে, কেউ পার পাবে না…. আর কোনো ভুল করা যাবে না, সুসময়ের কোকিলদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে… এসব বলার ন্যায্যতা তখনই হবে, যখন ক্ষমতায় আসতে পারবে। সবার আগে ভাবতে হবে কীভাবে ‘ত্রিদলীয় জোটের’ স্টিমরোলার থেকে দলীয় কর্মীদের বাঁচিয়ে রাখবে এবং কীভাবে স্টেপ বাই স্টেপ আন্দোলন-সংগ্রাম বেগবান করে মানুষের মন জয় করতে হবে।

আনফরচ্যুনেটলি এইসব অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং বার্নিং ইস্যু নিয়ে তাদের ওয়েল থিংকিং প্ল্যান এবং তার ইমপ্লিমেন্টেশনের ডিক্লারেশন অনুপস্থিত। বরং ইদানিং কে কত হার্ডকোর লীগার, কে সফ্টকোর, কারা লালবদর থেকে ভুল বুঝে ফিরে এসেও ষড়যন্ত্র করছে, কারা বিভেদ সৃষ্টি করে ‘নিশ্চিত ফিরে আসা’ ঠেকিয়ে দিতে চাচ্ছে এসব নিয়ে অন্তর্জালে চলছে চাপান-উতোর। খাঁটি বাংলায় কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি।

নিষিদ্ধকরণ বাস্তবায়ন করলে বিএনপি কত বড় ভুল করবে, দেশে কি ধরণের নৈরাজ্য নেমে আসবে, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তির কি কি ক্ষতি হবে, সেসব নিয়ে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি ভাবুক। জনগণ প্রত্যাশা করে আপনারা অন্তত আপনাদের পায়ের তলাকার মাটি শক্ত করার উদ্যোগ নিন। রাজনীতি করা একজন মানুষের জন্মগত অধিকার। সেটা কোনও আইন-কানুনে স্তব্ধ করা যায় না। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন ওঠে; যে দলে হাজার হাজার নেতা-কর্মী ছিল, কোটি কোটি সমর্থক ছিল, প্রশাসনের আগাপাশতরাজুড়ে ‘পক্ষের লোকজন’ ছিল, তারা কোথায়? ২৪-এর জুলাই-আগস্টে যে ভুল হয়েছে তা নিয়ে ‘শিবের গীত’ গেয়ে লাভ নেই। নিষিদ্ধ করলে আপনাদের কাউন্টার রি-অ্যাকশন কি হবে সেটাই মানুষ জানতে চায়, অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নয়।

খুবই বাস্তবসম্মত কথা―হঠকারী সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিলে হাজার হাজার নেতা-কর্মীর ওপর নির্যাতন হবে, গ্রেফতার হবে। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া রাজনীতিতে ফেরার দ্বিতীয় অপশন নেই। বাংলাদেশে কতগুলো জেলখানা? তার ধারণ ক্ষমতা কত? কতজন পুলিশ নামবে গ্রেফতার করতে? নিশ্চয়ই সকল নেতা-কর্মীকে গ্রেফতারের ক্ষমতা রাখে না সরকার? তাহলে আর কীভাবে ফেরার আশা করেন? ভারত কিংবা তথাকথিত পশ্চিমা শক্তির চাপে যে বিএনপি সরকার নমনীয় হবে না সেটা প্রমাণিত। তাহলে আর কোন ‘ঐশীশক্তির’ আশায় কর্মীদের বিপদের মুখে রেখে আশার বাণী শোনাচ্ছেন?

নেতারা বলছেন ’একাত্তরে পাকিস্তানও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছিল, ফলাফল―আওয়ামী লীগ দেশকে স্বাধীন করেই ফিরেছে। পঁচাত্তরের সেটব্যাক থেকেও ২১ বছর পর ফিরেছে। ইনশাআল্লাহ আবারও জনগণের ভালোবাসায় সগৌরবে ফিরবে’। তারা যদি মনে করেন ‘এবার ২১ বছর লাগবে না, সবে তো দেড় বছর হলো’। তাহলে তো তাদেরই বিজয় হচ্ছে, যারা গাল চেগিয়ে বলেছিল এবং এখনও বলে―”আওয়ামী লীগ ৫০ বছরেও ফিরতে পারবে না, ২০ বছর লাগবে ফিরতে, ১০ বছরেও পারবে না, বাংলাদেশের রাজনীতিতে লীগ এখন অপ্রাসঙ্গিক!”

Tags :

Monjurul Haque

Most Discussed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More on this topic

    People’s Agenda

Copyrights are reserved by NE News © 2025